গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— সাতাশ কালনীর জলে বাউলের গান শাহ আবদুল করিম
ড. জীবন বিশ্বাসঃ বর্ষার মৌসুমে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল যখন থৈ থৈ জলে নিমজ্জিত হয়ে অসীম আকাশের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়, তখন সেই কূলহীন জলরাশির বুক চিরে ভেসে চলা একলা নৌকার নিস্তব্ধতা ভাঙতে কোনো রাজকীয় অলংকার কিংবা জটিল রাগ—সংগীতের প্রয়োজন হয় না। সেই গম্ভীর নিস্তব্ধতার বুকে দোতারার একচিলতে কাঠ আর তারের স্পর্শে জেগে ওঠে এমন এক সুর, যা কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়ামে বসে লেখা সম্ভব নয়। ভাটি বাংলার মেঠো পলি, কালনী নদীর টালমাটাল ঢেউ, রোদে পোড়া কৃষকের ঋণের খাতা আর ভেজা পাটের তীব্র গন্ধ থেকে যাঁর কথা ও সুরের জন্ম, তিনি জল—কাদার জীবনযুদ্ধ থেকে উঠে আসা এক চিরন্তন ভাবসাধক বাউল শাহ আবদুল করিম। তিনি সাধারণ মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা না—বলা কথাগুলোকে সহজ বাণীতে রূপ দিয়ে সুরের পতাকায় আকাশের দিকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর গীতিকাব্যে জল কেবল নদীর বহমান ধারা নয়, জল হয়ে উঠেছিল সময়, শ্রান্তি, রাজনীতি, প্রেম এবং পরম সত্তাকে ডাকার এক সহজ ও অলৌকিক ভাষা।
জন্মবৃত্তান্ত, সংসার ও প্রয়াণরেখা
১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে এক চরম দারিদ্র্যপীড়িত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই সুরস্রষ্টা। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল আবদুল করিম, পিতা ইব্রাহিম আলী এবং মাতা নাইওরজান বিবি। শৈশব থেকে অভাবের সঙ্গে কঠিন লড়াই চালিয়ে এবং দীর্ঘ ৯৩ বছরের এক বিচিত্র জীবনপথ পরিক্রমা শেষে ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই অনন্য সাধকের জীবনাবসান ঘটে। বোরো ধান কাটার মেঠো শ্রম, রাখালিয়া—জীবন এবং হাওরের পলিমাটিতে ছড়িয়ে থাকা মেঠো গানকে সঙ্গী করে উজানধল গ্রাম থেকে শুরু হওয়া তাঁর জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এই জীবনরেখাটি কোনো সাধারণ সন—তারিখের হিসাব নয়; এটি মূলত স্বশিক্ষিত এক গ্রামীণ মানুষের বিশ্বমানের সাঙ্গীতিক সত্তায় রূপান্তরিত হওয়ার এক ঐতিহাসিক দলিল।
প্রকৃতির শিক্ষা ও মরমি ভাবধারার উত্তরাধিকার
বাল্যকালে তাঁর দিন কাটত অন্যের গরু চরিয়ে কিংবা ক্ষেত—খামারে কায়িক শ্রম দিয়ে। নৈশ—বিদ্যালয়ে মাত্র কয়েক দিনের যাতায়াত ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। তবে প্রকৃতি, পরিবেশ আর মানুষের মুখের ভাষাই ছিল তাঁর আসল পাঠশালা। গুরু শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশের সংস্পর্শে এসে তাঁর অন্তরের সুপ্ত সাঙ্গীতিক চেতনা প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে। এছাড়া লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, রাধারমণ দত্ত এবং হাসন রাজার প্রাচীন মরমি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে তিনি নিজের ভেতরে গভীর আন্তরিকতায় ধারণ করেছিলেন। তবে সেই ভাবধারাকে তিনি প্রথাগত অনুকরণে আটকে রাখেননি বরং নিজের অভিজ্ঞতার পাত্রে ছেঁকে তাকে করে তুলেছিলেন একবিংশ শতাব্দীর সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
প্রেম ও বিরহের গভীর মাত্রা
তাঁর জীবনে স্ত্রী আফতাবুন্নেসা, যাকে তিনি গভীর প্রেমে ‘সরলা’ বলে ডাকতেন, ছিলেন এক পরম প্রেরণা ও আত্মিক আশ্রয়। চরম দারিদে্র্যর দিনেও যিনি ছায়ার মতো পাশে ছিলেন, সেই সরলার স্মৃতিতেই পরবতীর্তে ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গানের সংকলন ‘আফতাব সঙ্গীত’। তাঁর রচিত প্রেমের গানগুলোতে প্রথাগত চপল রোমান্টিকতার বদলে ফুটে ওঠে এক ধরনের সুগভীর স্থায়িত্ব, দাম্পত্য সহমর্মিতা এবং হারানোর বেদনাবিধুরতা। ‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু’ কিংবা ‘কেমনে ভুলিব আমি’ পদগুলোতে প্রেম কেবল কোনো কাল্পনিক অনুরাগ নয়, তাহলো জীবনসংগ্রামের ভেতর দুটি মানুষের যৌথ বেঁচে থাকার গল্প এবং বিচ্ছেদের এক চিরন্তন হাহাকার।
গণমানুষের প্রতিবাদ, অসাম্য ও রাজনৈতিক চেতনার গান
তাঁর পদাবলিকে কেবল নিভৃত বাউল সাধনার ফ্রেমে বন্দি রাখা যায় না। তিনি ছিলেন একাধারে বাউল, লোক—দার্শনিক এবং শোষিত মানুষের গণ—গীতিকার। তাঁর রচনায় যেমন গুরুকৃপা ও দেহতত্ত্বের নিবিড় ব্যাখ্যা আছে, তেমনি আছে সামন্তবাদী অত্যাচার, মহাজনী শোষণ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সরাসরি চাবুক এবং মেহনতি মানুষের মৌলিক অধিকারের দাবি। ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান’ গানটি কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, এটি লোকায়ত অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ইশতেহার। আবার ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানে গ্রামীণ জীবনের যৌথ আনন্দের ক্ষয় এবং আধুনিক নাগরিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক গভীর মনোস্তাত্ত্বিক ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৫২—র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯—এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১—এর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে তাঁর গান আন্দোলনকারী জনতার মুখে মুখে প্রেরণা হয়ে ফিরেছে। মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনৈতিক জননায়কেরা বিভিন্ন সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে তাঁর এই গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন এবং প্রেরণা আহরণ করেছেন।
প্রতীকী উপমা, লোকজ রূপক ও গভীর কাব্যিক প্রজ্ঞা
তাঁর গীতিকবিতার প্রধান শক্তি ছিল প্রাত্যহিক চেনা উপাদানের আড়ালে সুগভীর দর্শনকে সাজিয়ে রাখা। ‘গাড়ি চলে না, চলে না রে’ শুনলে প্রথম পাঠে মনে হতে পারে কোনো জরাজীর্ণ বাহনের গল্প। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এটি জরাজীর্ণ মানবদেহের পাশাপাশি এক স্থবির সমাজব্যবস্থারও চমৎকার রূপক। ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইলো’ কিংবা ‘মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না’ পদে অত্যন্ত সহজ মেঠো শব্দের ভেতর দিয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য ও নশ্বর জীবনচেতনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সাধারণ কৃষকের মেধা থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকের বুদ্ধিকেও সমানভাবে নাড়া দেয়। জটিল দর্শনকে সাবলীল আঞ্চলিক ভঙ্গিতে প্রকাশ করার এই দক্ষতা বঙ্গীয় সাহিত্যে অত্যন্ত বিরল।
বিলম্বিত নগর—স্বীকৃতি, সাহিত্যকর্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান
জীবনসায়াহ্নের পূর্ব পর্যন্ত তিনি মূলত হাওরাঞ্চলের গ্রামীণ আসর ও বাউল মেলার শিল্পী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। শহুরে মূলধারার আধুনিক প্রযুক্তি, মিডিয়া এবং তরুণ প্রজন্মের ব্যান্ডসংগীতের মাধ্যমে তাঁর গানের সুর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে অনেক পরে। মাটির এই খাঁটি শিল্প শহরের কোলাহলে পৌঁছাতে সময় নিলেও তার আবেদন কখনোই কমেনি। ২০০১ সালে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাপূর্ণ ‘একুশে পদক’—এ ভূষিত করা হয়। তাঁর জীবদ্দশায় ও পরবতীর্তে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘আফতাব সঙ্গীত’, ‘গণসঙ্গীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘ধলমেলা’, ‘ভাটির চিঠি’, ‘কালনীর কূলে’ এবং ‘শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র’।
শাহ আবদুল করিমের কয়েকটি বিখ্যাত গান
১। আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, ২। গাড়ি চলে না চলে না চলেনা রে, ৩। বন্ধে মায়া লাগাইছে, ৪। কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু, ৫। আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, ৬। বসন্ত বাতাসে সই গো, ৭। কোন মেস্তরি নাও বানাইলো, ৮। তুমি মানুষ আমি মানুষ, ৯। আমি বাংলা মায়ের ছেলে, ১০। রঙের দুনিয়া তরে চাই না, ১১। তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো, ১২। আমি তোমার কলের গাড়ি, ১৩। মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে, ১৪। কেমনে ভুলিব আমি, ১৫। আইলায় না আইলায় নারে বন্ধু, ১৬। আসি বলে গেল বন্ধু আইল না, ১৭। গান গাই আমার মনরে বুঝাই, ১৮। আগের বাহাদুরি গেল কই, ১৯। ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও, ২০। আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা, ২১। মন মজালে ওরে বাউলা গান, ২২। মুর্শিদ ধন হে, ২৩। মন মিলে মানুষ মিলে সময় মিলে না, ২৪। তুমি বিনে আকুল পরাণ, ২৫। ভবসাগরের নাইয়া।
পরিশেষ
শাহ আবদুল করিমের আসল স্থানটি কোনো বাঁধাই করা ইতিহাস গ্রন্থের পাতায় নয়, তাঁর আসল ঠিকানা কালনী নদীর হাওয়ায় এবং খেটে খাওয়া মানুষের বুকের গভীর অনুভূতির ভেতর। তিনি হাওরের নির্জনতাকে সুরের ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন, অথচ শিকড় উপড়ে কখনো শহরের চাকচিক্যে নিজেকে বিকিয়ে দেননি। পলিমাটির নিঃস্বতা যে কত বড় সুরের আধার, তাঁর সৃষ্টিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বর্ষার রাতে হাওরের ওপর দিয়ে যখন ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যায়, তখন সেই তরঙ্গের শব্দের ভেতরে আজও যেন একতারার সেই চিরচেনা প্রশ্নটি ধ্বনিত হয়—মানুষের দুঃখ না বুঝে, মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে, সুরের মুক্তি কি সত্যিই সম্ভব?
