সুখবর কি আছে কোনো || জাহীদ রেজা নূর

বাজেট এবং বিশ্বকাপের জন্য সামনের বড় একটা সময় উত্তাপ থাকবে। এবার বিশ্বকাপের উত্তেজনা কতটা সৌরভ ছড়াবে, তা এখনই বলে দেওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বাস্কেট বল কিংবা টেনিস নিয়ে যতটা আগ্রহ দেখায়, ফুটবল নিয়ে ততটা নয়। তারপরও তারা অন্যতম আয়োজক দেশ হয়েছে। রাশিয়াইউক্রেন আর যুক্তরাষ্ট্রইসরায়েলইরান যুদ্ধ বিশ্বকাপের ওপর কতটা প্রভাব বিস্তার করবে, সেটাও দেখবে বিশ্ব।

দেশের বাজেট নিয়ে নিশ্চয়ই বহু আলোচনা হবে। ইউনূস আমলের বিনিয়োগ নিয়ে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, তা থেকে উঠে আসার কোনো উপায় আছে কি না, তা নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা হবে। তবে কথা বলা যায়, এখন পর্যন্ত এমন কোনো ভাবনার দেখা মেলেনি, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারে। সোনার দাম কমলে তাতে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হয় না, বরং নিত্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে পারলে সাধারণ মানুষ খুশি হয়। বিজ্ঞজনদের আলোচনায় সেটাও আমরা নিশ্চয়ই দেখব।

কিন্তু যে আলোচনাটি এখন খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে, তা হলো, আমরা কি রাজনৈতিকভাবে সহনশীল হয়ে ওঠার শিক্ষা নিতে পারব, নাকি পরস্পর বিদ্বেষই হয়ে উঠবে আমাদের ললাটলিখন? গণতান্ত্রিক সহনশীলতার অবস্থা যে একেবারেই ভালো নয়, সে কথা বলে দিতে হয় না।

.

দেশের বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় নির্দেশ অমান্য করার বহু ঘটনা ঘটিয়েছেন। পেশিশক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এটি সদ্য ক্ষমতায় আসা দলটির জন্য অশনিসংকেত। তৃণমূলে অন্যায়অবিচার চলতে থাকলে তা কেন্দ্রকেও বিচলিত করে তুলবে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তখন তারা কী করবে, সেটা আগেভাগে বলে দেওয়া যায় না। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যদিখাই খাইভাবটি এভাবেই টিকে থাকে, তবে তা কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না। দেশের জনগণ কত দিন এইসব আইনবহির্ভূত ক্ষমতার প্রকাশ সহ্য করবে, সেটা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এখনই এই কথা বলা যায়, এক সরকার যায়, আরেক সরকার আসেএ কিন্তু দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পেশিশক্তির পরিবর্তন হয় না। বরং দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান দিনের পর দিন নিম্নমুখীই হয়ে চলেছে। স্থানীয় পেশিশক্তির প্রতিভূদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বেশির ভাগ সময় মৌন থাকে, তো লুকোবার নয়। পুলিশের গ্রহণযোগ্যতা যে রকম ঘটনায় কমে যায়, সেটা সবাই বোঝে, কিন্তু ক্ষমতার ধারকবাহকেরা বোঝেন না।

আদালতে জামিন নিয়ে যা ঘটে চলেছে, তাতে আইনের শাসনের ব্যাপারে সন্দেহ বাড়ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কত বড় বড় কথাই না বলে থাকে রাজনৈতিক দলগুলো, কিন্তু কোনো দলই শেষ পর্যন্ত বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চায় না। যখন আদালতের বিচারকেরা জানেন, তাঁদের বদলি, পদোন্নতির সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নিবিড় সম্পর্ক আছে, তখন তাঁদের মনস্তত্ত্ব কী রকম হয়, সেটা কি বলে দিতে হবে? পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা কখন, কোন অবস্থায় নিজেদের দলীয় পরিচয় প্রকাশ করেন, সেটা কি বোঝা যায় না? আমলাতন্ত্র যদি দলীয় আমলাতন্ত্র হয়, তাহলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তো সব সরকারি কর্মকর্তাকে পরিবর্তন করতে হবে। এভাবে কি একটা দেশ চলতে পারে? তাহলে পরিবর্তনটা কী হলো?

.

ইউনূস আমলের কিচেন ক্যাবিনেট নিয়ে যে মুখরোচক আলাপ চলছে এখনো, তা আমাদেরখাসলতপ্রকাশ করে। উপদেষ্টাদের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। কারা সেই কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্য, তা নিয়েও জল্পনাকল্পনা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা কে কোথায় রয়েছেন, কে কে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কারা দুর্নীতি করেছেন, তা নিয় মুখরোচক আলাপ হচ্ছে রকেরেস্তোরাঁয়।

বর্তমান সরকার ইউনূস সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগগুলো কেন খতিয়ে দেখার কথা ভাবছে না, তা নিয়ে কিন্তু এরই মধ্যে মানুষ কথা বলতে শুরু করেছে। তুলনামূলক শাসনামলের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জনগণ খেয়াল করে দেখেছে, ভালো কোনো পরিবর্তনের দিকে এখনো দেশ যায়নি। এই সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী এমন সব কথা বলেছেন, যা নিয়েও প্রচুর সমালোচনা হয়েছে। জামিন নিয়ে যা ঘটে চলেছে এবং মামলাবাণিজ্যের কারণে কত মানুষ যে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে, তা বিবেচনায় নিয়ে বোঝা যায়, এই পুরো বিষয়টিই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রূপকথার মতো হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, যা থেকে শিল্পী, খেলোয়াড়, সাংবাদিক কেউই বাদ পড়েননি। বিদেশে থাকা অবস্থায় কী করে কোনো খেলোয়াড় বা শিল্পী হত্যা মামলারআসামিহতে পারেন, তা বোধগম্য নয়। রূপকথাতে অবশ্য তা সম্ভব। আলাদিনের দৈত্য হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা থেকে কোনো শিল্পীকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে। সেই শিল্পী আরও অর্ধশতাধিক মানুষের সঙ্গে যোগসাজশ করে একজনকে হত্যা করার চেষ্টা করেছেন। ভাবা যায়! কল্পনা কতটা নিরেট হতে পারলে এই ধরনের মামলা দেওয়া সম্ভব?

.

সাধারণ মানুষ এখন খবরের কাগজের জন্য অথবা টেলিভিশনের খবরের জন্য অপেক্ষা করে না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খবরকেই বিশ্বাস করে। অনেকেই বস্তুনিষ্ঠ কনটেন্ট তৈরি করেন, কিন্তু বহু লোক মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে দেয়। যদি বদ মতলব থাকে, তাহলে গোয়েবলসীয় কায়দায় মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে। ইউটিউবের বহু কনটেন্টে সে রকম মিথ্যার ছড়াছড়ি দেখা যায়। যেহেতু সত্য যাচাই করে নেওয়ার মতো সময় বা তথ্যউপাত্ত হাতের কাছে থাকে না, তাই এইসব মিথ্যাচারকে সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয় মানুষ। এটা একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে বর্তমান পৃথিবীতে। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এরই মধ্যে অনেক মিথ্যাচার করেছে। ইতিহাসের যথার্থতাকে খর্ব করেছে। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করার কার্যকারণ বর্ণনা করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে।

এরই মধ্যে মহাশক্তিধর এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গোটা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকেই বুঝে নাবুঝে এআই ব্যবহার করা শুরু করেছে। এআই তার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজের মতো করে জ্ঞান বিতরণ করে যাচ্ছে। তাতে যে কত আজগুবি ব্যাপার থাকে, সেটা আর নাইবা বললাম। শুধু একটা ঘটনার উল্লেখ করি।

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল জীবনানন্দ দাশের একটি করে প্রেমের কবিতার প্রথম পঙক্তি দিতে অনুরোধ করেছিলাম চ্যাটজিপিটিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তিন কবির তরতাজা তিনটি প্রেমের কবিতা পেয়ে গেলাম। ভাগ্যক্রমে তিনটি কবিতাই আমার পূর্বপঠিত। দেখলাম তিনটি কবিতারই তৃতীয় চতুর্থ পঙক্তি নির্দিষ্ট কবির লেখা নয়। প্রথম দুই পঙক্তির সঙ্গে কোথা থেকে অন্য কারও দুটি করে পঙক্তি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা উদ্ধার করা আমার কম্ম নয়। আমি লিখলাম, ‘আপনি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনটি কবিতার তৃতীয় চতুর্থ পঙক্তি এই কবিদের নয়।এর উত্তরে চ্যাটজিপিটি লিখল, ‘আপনি ঠিক ধরেছেন, আমি আপনার সঙ্গে প্রতারণা করেছি।ভাবুন একবার!

প্রতারণার ফল তার স্বার্থ রক্ষা করলে মানুষ প্রতারিত হতেও পছন্দ করে। তাই মুহূর্তে সরকারি বা বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যে কথাচালাচালি হচ্ছে, তাতে কি সত্যিই একটি জম্পেশ সংসদের দেখা পাচ্ছে জনগণ? নাকি প্রতারণার হাতছানি এখানেও আছে? এই প্রশ্ন কিন্তু ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে।

.

নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় লেবাস পরানোর যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তা জাতির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্য জনদরদি মানুষ নির্বাচিত হবেন, সেটাই কাম্য। তাতে রাজনৈতিক ভারসাম্যের পাশাপাশি ন্যায় শাসনও পোক্ত হয়। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার যেকোনো ঘটনাই গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিগত সময়ে সংসদ নির্বাচন নিয়ে কত রকম পানি ঘোলা করা হয়েছে, সে কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। সম্প্রতি আওয়ামী আমলেরআমরা আর মামুরানির্বাচনের রেশ ধরে বার কাউন্সিলের নির্বাচন করেছে বিএনপিজামায়াতএনসিপি। ধরনের লজ্জা যেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরেও তৈরি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।

বর্তমানে জনগণের জন্য কি সত্যিই কোনো সুখবর আছে? দ্রব্যমূল্য, তেলের মূল্য, বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সর্বত্র কি এমন কোনো সুখবর দেওয়া গেছে, যা মানুষের মনে স্বস্তি আনতে পারে?

জনগণের জন্যই রাজনীতিএই কথাটি রাজনৈতিক দলগুলো মনে রাখলেই মঙ্গল। কিন্তু বেশির ভাগ সময় তারা সে কথা মনে রাখে না, এটাই আক্ষেপের জায়গা।

Related Posts