৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্পঃ ইলিনয় দ্য হাউস অন ম্যাঙ্গো স্ট্রিটঃ স্যান্ড্রা সিসনেরোস || আবদুল্লাহ জাহিদ

খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে স্যান্ড্রা সিসনেরোসের দ্য হাউস অন ম্যাঙ্গো স্ট্রিট এক কিশোরীর বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন শহুরে নিঃসঙ্গতার আখ্যান।

আমেরিকার বড় বড় নগরীর ইতিহাস কেবল আকাশছোঁয়া অট্টালিকার ইতিহাস নয়; বরং সেই শহরের গলিপথে হারিয়ে যাওয়া মানুষের ছোট ছোট স্বপ্ন, বেদনা, প্রেম, অভিমান আর আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ের ইতিহাসও বটে। শিকাগো শহরকে আমরা সাধারণত জানি স্থাপত্য, জ্যাজ সঙ্গীত, শিল্পসংস্কৃতি কিংবা গ্যাংস্টার ইতিহাসের জন্য। কিন্তু এই শহরের আরেকটি মুখ আছেÑ লাতিনো অভিবাসীদের সংগ্রাম, নিম্নবিত্ত মানুষের ঘিঞ্জি বসতি, আর বর্ণ শ্রেণিগত বৈষম্যের বাস্তবতা। সেই অচেনা শিকাগোকেই সাহিত্যের এক অনন্য ভাষায় বিশ্বপাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন স্যান্ড্রা সিসনেরোস (ঝধহফৎধ ঈরংহবৎড়ং) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য হাউস অন ম্যাঙ্গো স্ট্রিট (ঞযব ঐড়ঁংব ড়হ গধহমড় ঝঃৎববঃ)—এ।

মাত্র অল্প কিছু পৃষ্ঠার বই। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বিশাল পৃথিবী। এটি প্রচলিত অর্থে সরলরৈখিক উপন্যাস নয়; বরং ছোট ছোট ভিনিয়েট বা খন্ডচিত্রে গড়া এক স্মৃতিনির্ভর জীবনকাব্য। প্রতিটি অংশ যেন একটি জানালা, যেখান দিয়ে দেখা যায় এক কিশোরীর বড় হয়ে ওঠা, তার চারপাশের মানুষদের জীবন, নারীদের স্বপ্নভঙ্গ, প্রেমের আকাক্সক্ষা, দারিদে্র্যর বদ্ধ ঘর, এবং সবকিছুর মাঝেও মুক্তির এক অদম্য আকুলতা।

ম্যাঙ্গো স্ট্রিট: একটি রাস্তা, একটি প্রতীক

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এসপেরাঞ্জা করদেরো। নামের অর্থইআশা এই নাম যেন কাকতালীয় নয়। কারণ পুরো উপন্যাস জুড়ে সে আসলে আশারই প্রতিনিধিত্ব করেÑএকটি দরিদ্র লাতিনো পরিবারের মেয়ের স্বপ্ন দেখার সাহস।

এসপেরাঞ্জার পরিবার বহুদিন ধরে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরে বেড়িয়েছে। অবশেষে তারা আসেম্যাঙ্গো স্ট্রিট’—এর ছোট্ট একটি বাড়িতে। কিন্তু সেই বাড়ি তাদের কল্পনার বাড়ি নয়। না আছে সুন্দর বাগান, না আছে কাঠের সিঁড়ি, না আছে পর্যাপ্ত জায়গা। দেয়াল ভাঙা, ঘর ছোট, চারপাশে দরিদ্র মানুষের ভিড়। এসপেরাঞ্জা অনুভব করে, এই বাড়ি যেন তাদের সামাজিক অবস্থানের এক নির্মম প্রতীক।

সে লজ্জা পায় যখন স্কুলের সিস্টার বাড়িটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘তোমরা এখানে থাকো?’ সেই মুহূর্তে শিশুমনের ভেতরে শ্রেণিগত অপমানের প্রথম বীজটি প্রবেশ করে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ম্যাঙ্গো স্ট্রিটকে সে কখনো পুরোপুরি ঘৃণা করতে পারে না। কারণ এখানেই তার শৈশব, এখানেই তার বন্ধু, এখানেই প্রথম পৃথিবীকে চেনা।

শিকাগো শহর ইলিনয়ের সামাজিক বাস্তবতা

এই বইটির সঙ্গে ইলিনয়ের সম্পর্ক গভীর অবিচ্ছেদ্য। সিসনেরোসের নিজের বেড়ে ওঠা শিকাগোর লাতিনো অধ্যুষিত এলাকায়। ফলে বইয়ের ম্যাঙ্গো স্ট্রিট আসলে শিকাগোর বহু বাস্তব রাস্তাঘাট অভিবাসী জীবনের প্রতিচ্ছবি।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শিকাগোতে বিপুল সংখ্যক মেক্সিকান লাতিনো অভিবাসী এসে বসতি গড়ে। কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্য, বর্ণবাদ, ভাষাগত বিচ্ছিন্নতা এবং দারিদ্রতা তাদের জীবনকে কঠিন করে তোলে।দ্য হাউস অন ম্যাঙ্গো স্ট্রিটসেই সমাজবাস্তবতাকে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে নয়, বরং ব্যক্তিগত অনুভবের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করেছে।

শহরের কেন্দ্রের ঝলমলে অট্টালিকার বিপরীতে ম্যাঙ্গো স্ট্রিট যেন আরেক আমেরিকাÑযেখানে মানুষ বেঁচে থাকে সীমাবদ্ধতার মধ্যে। মেয়েরা জানালার পাশে বসে জীবন কাটায়, পুরুষেরা ক্লান্ত শ্রমিক, শিশুরা দ্রুত বড় হয়ে যায়।

এই উপন্যাসে শিকাগো কেবল একটি শহর নয়; বরং একটি মানসিক ভূগোল।

এসপেরাঞ্জা: মুক্তির স্বপ্ন দেখা এক কিশোরী

এসপেরাঞ্জা চরিত্রটি আধুনিক আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় কিশোরী চরিত্র। সে সংবেদনশীল, কল্পনাপ্রবণ, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। চারপাশের নারীদের জীবন দেখে সে বুঝতে শেখে, দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়; এটি স্বাধীনতারও অভাব।

তার মা একসময় আঁকতে পারতেন, গান গাইতেন, পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর গৃহবন্দী জীবনে তাঁর প্রতিভা হারিয়ে গেছে। প্রতিবেশী অনেক নারী জানালার ধারে বসে জীবন কাটান স্বামী বা সমাজের সীমাবদ্ধতায় আটকে।

এসপেরাঞ্জা বুঝতে পারে, সে সেই ভাগ্য মেনে নেবে না।

সে লেখক হতে চায়। সে এমন একটি বাড়ির স্বপ্ন দেখে যা হবেনিজের’Ñযেখানে কেউ তাকে অপমান করবে না, করুণা করবে না।

উপন্যাসের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক হলো এসপেরাঞ্জা যখন মুক্তি চায়, তখনও সে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করে না। সে বলে, একদিন সে ফিরে আসবে তাদের জন্য যারা এখনো বের হতে পারেনি।

নারীদের জীবন: নীরব বেদনার প্রতিচ্ছবি

এই বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি হলো নারীদের জীবনচিত্র।

স্যালি

উপন্যাসের সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্রদের একজন স্যালি। স্যালি অত্যন্ত সুন্দরী। তার চোখ মিশরীয় নারীদের মতো, চুল কালো মসৃণ। কিন্তু তার জীবন ভীষণ দুঃখের।

তার বাবা তাকে মারধর করে, কারণ সে সুন্দরী। এবং বাবা ভয় পায় মেয়েটিখারাপ পথেযাবে। পরে স্যালি খুব অল্প বয়সে বিয়ে করে ফেলে এই কথা ভেবে যে এতে সে স্বাধীন হবে।

কিন্তু বিয়ের পর সে আরও বন্দি হয়ে পড়ে।

তার স্বামী তাকে বাইরে যেতে দেয় না, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে দেয় না। জানালার পাশে বসে থাকা স্যালি যেন বন্দি পাখি।

স্যালির জীবন দেখে এস্পেরাঞ্জা বুঝতে পারে, নারীদের জন্য সমাজ কত নিষ্ঠুর হতে পারে।

মারিন

মারিন এক তরুণী, যে সন্ধ্যায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। তার বিশ্বাস, একদিন কোনো ধনী পুরুষ গাড়ি নিয়ে এসে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে।

সে সবসময় সাজগোজ করে, নাচে, ছেলেদের দিকে তাকায়।

কিন্তু পাঠক বুঝতে পারেÑ স্বপ্নের ভেতরে গভীর হতাশা লুকিয়ে আছে।

রাফায়েলা

রাফায়েলার স্বামী তাকে ঘরে আটকে রাখে, কারণ সে সুন্দরী।

রাফায়েলা জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে বাচ্চারা তার জন্য নারকেলের রস বা পেঁপের জুস কিনে দেয়, যেটি ঝুড়ি বেয়ে ওপরে ওঠানো হয়।

এই দৃশ্যগুলো উপন্যাসে অত্যন্ত কাব্যিক। কিন্তু একই সঙ্গে ভীষণ বেদনাদায়ক।

ভাষার জাদু

এই বইয়ের ভাষা অসাধারণ। এটি একই সঙ্গে কবিতা গদ্য। ছোট ছোট বাক্য, চিত্রময় বর্ণনা, শিশুসুলভ সরলতাÑসব মিলিয়ে ভাষাটি একধরনের সংগীত তৈরি করে।

যেমন, একটি বাড়ির বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক এমনভাবে শব্দ ব্যবহার করেন যে পাঠক যেন ঘরটির দেয়াল, জানালা, ধুলো, গন্ধ সব অনুভব করতে পারেন।

সিসনেরোসের ভাষা সংযত, কিন্তু আবেগপূর্ণ। কোথাও বাড়তি নাটকীয়তা নেই। তবু অল্প শব্দেই তিনি গভীর বেদনা প্রকাশ করতে পারেন।

প্রেম, যৌবন হারিয়ে যাওয়া নিষ্পাপতা

উপন্যাসে কৈশোরের জাগরণও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসপেরাঞ্জা ধীরে ধীরে নারী হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। সে প্রেম, শরীর, আকর্ষণ, ভয়সবকিছু নতুনভাবে আবিষ্কার করতে থাকে।

কিছু দৃশ্য খুব কোমল, কিছু দৃশ্য অস্বস্তিকর। বিশেষ করে যৌন হয়রানি নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখক অত্যন্ত সূক্ষ¥ কিন্তু শক্তিশালী ভাষায় লিখেছেন।

এই অভিজ্ঞতাগুলো এসপেরাঞ্জাকে দ্রুত পরিণত করে তোলে।

কেন বইটি এত গুরুত্বপূর্ণ

দ্য হাউস অন ম্যাঙ্গো স্ট্রিট প্রকাশিত হওয়ার পর দ্রুতই আমেরিকান সাহিত্যে বিশেষ স্থান করে নেয়। কারণ এর আগে লাতিনো কিশোরী মেয়েদের অভিজ্ঞতা এত আন্তরিক সাহিত্যিক শক্তিতে খুব কমই উঠে এসেছিল।

নারীবাদী সাহিত্য, অভিবাসী সাহিত্য, চিকানো সাহিত্যসব ক্ষেত্রেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

সবচেয়ে বড় কথা, এটি এমন এক বই যা ভিন্ন সংস্কৃতির পাঠকের কাছেও আপন মনে হয়। কারণ এসপেরাঞ্জার স্বপ্ন আসলে সর্বজনীনÑএকটি ভাল জীবন, নিজের পরিচয়, নিজের ঘর, নিজের কণ্ঠস্বর।

যারা বড় শহরের গলিতে বড় হয়েছেন, যাদের শৈশবে অপূর্ণতা ছিল, যারা কোনোদিন নিজের বাড়ির স্বপ্ন দেখেছেনÑতাদের কাছে বইটি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর মনে হবে।

বাংলাদেশী পাঠকদের কাছেও বইটির আবেদন গভীর হতে পারে। কারণ আমাদের সমাজেও অসংখ্য এসপেরাঞ্জা আছে, যারা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও মুক্তির স্বপ্ন দেখে।

দ্য হাউস অন ম্যাঙ্গো স্ট্রিট এমন এক সাহিত্যকর্ম যা পাঠ শেষে মনে হয়, আমরা যেন কারও ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ে এলাম।

লেখক পরিচিতি

স্যান্ড্রা সিসনেরোস: প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর।

স্যান্ড্রা সিসনেরোস ১৯৫৪ সালে শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার মেক্সিকান বংশোদ্ভূত। তিনি বারবার স্থান পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর লেখার মূল উপাদান হয়ে ওঠে।

দ্য হাউস অন ম্যাঙ্গো স্ট্রিটতাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।



Related Posts