তাহাদের কথা পর্ব—২৭ কেভিনের নীল রঙের কষ্ট || পরাগ সঞ্চিতা

কেভিনের সাথে মন খুলে আলাপের একমাত্র উপায় হলো ইমেইল। সামনা—সামনি বসে ওর সাথে কথা বলা আর এক ঝক্কি! চিৎকার করে আর কতক্ষণ কথা চালানো যায়! কেভিন দু—কানেই তেমন শুনতে পায় না, সস্তা সুপার মার্কেট থেকে হিয়ারিং এইড কিনে শোনার চেষ্টা করে, কিন্তু তাতে তেমন কাজ হয় না। কখনো কখনো রাইটিং প্যাডে লিখে আমি ওকে প্রশ্ন করি, আর ও আমার সেই লিখিত প্রশ্ন পড়ে পড়ে উত্তর দেয়। মাঝে মাঝে আমি খেই হারিয়ে ফেলি, কতক্ষণ আর এভাবে কমিউনিকেশন করা যায়? কিন্তু এতো ঝক্কির মধ্যেও ওর সাথে আমার একধরনের সখ্য গড়ে উঠেছে। ওর ইমেইল পড়ে পড়ে আমি অন্য আর এক কেভিনকে খুঁজে পেয়েছি। ওর লম্বা ইমেইলগুলো প্রতিটি আমি অভিভূতের মতো পড়ি। আর ওর লেখা পড়তে পড়তে আমার মনে হয় দামি কোনো সায়েন্স ফিকশনের অংশবিশেষ পড়ছি। আবার কখনো মনে হয় ইংলিশ লিটারেচারের দক্ষ কোনো লেখকের লেখা পড়ছি। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রকাশক হলে আমি ওর একটা বই ছেপে ফেলতাম।

ও বলাই হয়নি, কেভিন থার্ড স্টেজ লিপোসারকোমা ক্যান্সারে ভুগছে। কিছুদিন আগে কেভিনের ডান কানের নীচে হঠাৎ করে একটি লিম্ফ নোড বা সিস্টের মতো হয়েছিল। আর পরে ধরা পড়লো যে ওটা ক্যান্সার। কেভিনের চিকিৎসকরা ওর কানে না শুনতে পাওয়ার সমস্যাটির চেয়ে ক্যান্সার চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাই আমাকে আপাতত ইমেইলে কথোপকথন চালাতে হচ্ছে। কেভিন সাতাত্তর বছর বয়সী এক চির যুবক প্রবীণ। কেভিন প্রবীণদের আবাস বা হোমে থাকে, সরকারি পেনশনে কোনোভাবে চলে যায় জীবন আর জীবিকা। বুদ্ধিদীপ্ত নীল চোখ আর সোনালী চুলের এই হালকা পাতলা গড়নের কেভিন মানসিক রোগে ভুগছে। ওর ডায়াগনোসিস হলো স্কিজোঅ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার, বাইপোলার ধরন। স্কিজোঅ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার, বাইপোলার ধরন হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, এই রোগে স্কিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলোর সাথে বাইপোলার ধরনের মেজাজ—সংক্রান্ত ব্যাধির (সড়ড়ফ ফরংড়ৎফবৎ) লক্ষণগুলোর সংমিশ্রণ ঘটে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ যেমন হ্যালুসিনেশন, ডিলিউশন বা অসংগঠিত চিন্তাভাবনার পাশাপাশি মেজাজের গুরুতর পর্বÑবিশেষত ম্যানিয়া বা মিশ্র পর্ব (এবং প্রায়শই গুরুতর বিষণ্ণতার পর্ব) অনুভব করে। 

যুবক বয়সে কেভিন কানেকটিকাটের হার্টফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে বায়োলজিতে গ্রাজুয়েশন করে কোনো একটি নামকরা বায়ো—ল্যাবে কাজ করেছে। তারপর কেভিনকে এক সময় ছবি আঁকার নেশায় পায়! কিছু টাকা পয়সা জমিয়ে, চাকরি বাকরি ছেড়ে ও চলে যায় ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোর বে এরিয়াতে। ওখানে ভর্তি হয় একটি আর্ট কলেজে। কলেজে পড়তে পড়তে মাথায় কি খেয়াল চাপে কেভিন চলে যায় মাদাগাস্কার দ্বীপের জঙ্গলে পশু পাখির ছবি আঁকতে। কেভিন মাদাগাস্কারে গিয়ে হরেক রকমের লেমুরের স্কেচ আঁকা শুরু করে। কেভিন মাদাগাস্কারে ওর অভিযান নিয়ে কথা বলতে খুব পছন্দ করে। ওর বিবরণ বার বার শুনতে শুনতে আমার তো অনেকটা মুখস্থ হয়ে গেছে। ওর কাছ থেকে জেনেছি এই দ্বীপটির সবচেয়ে বিখ্যাত বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে ১০০—এরও বেশি প্রজাতির প্রাইমেটÑ যাদের মধ্যে ক্ষুদ্রাকৃতির মাউস লেমুর থেকে শুরু করে দলবদ্ধভাবে বসবাসকারী রিং—টেইলড লেমুর এবং সুরেলা কণ্ঠের ইন্দ্রি’ও অন্তর্ভুক্ত। ইন্দ্রি মাদাগাস্কারের গহীন রেইন ফরেস্টে বসবাসকারী লেজহীন এক অদ্ভুত প্রাইমেট, যার ভোরের সমবেত গান শুনলে মনে হবে যেন বনের ভেতর কোনো অপার্থিব সাইরেন বাজছে! শুধু প্রাণী না বরং মাদাগাস্কারে গিয়ে কেভিন পরিচিত হয় অদ্ভুত সব উদ্ভিদ আর গাছ গাছালির সাথে। মাদাগাস্কারের জঙ্গলে ১২,০০০—এরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ৮৩% থেকে ৯০% প্রজাতিই পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না, যার কারণ হলো ৮ কোটি ৮০ লক্ষ বছর ধরে এর ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা। কেভিন সেখানে দেখা পায় বাওবাব গাছ, অক্টোপাস গাছ, আর তাহিনা পাম গাছের। তাহিনা পাম একটি বিশালকার ‘সুইসাইড পাম’ (ংঁরপরফব ঢ়ধষস), যা প্রায় ৫০ বছর ধরে নীরবে বেড়ে ওঠে, এরপর এক বিশাল ও একটি পুষ্পমঞ্জরি মেলে ধরে এবং তারপর মারা যায়। সেই থেকেই কেভিনের ধারণা জন্মায় যে মাদাগাস্কারের অদ্ভুত অদ্ভুত উদ্ভিদ আর গাছ গাছালির মধ্যে এলিয়েন বা ভিনগ্রহের বাসিন্দারা বসবাস করে! কেভিন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এলিয়েনরা বা ভিনগ্রহের বাসিন্দারা অদ্ভুত আকারের গাছপালার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। ওর মানসিক রোগের উৎপত্তি তখন থেকেই। কেভিন দাবি করতে শুরু করে যে ওর সাথে ভিনগ্রহীদের সাক্ষাৎ হয়েছিল, ও এলিয়েনদের শুধু দেখেনি, বরং এলিয়েনরা তিন তিন বার ওকে অপহরণ করে ইউএফওতে করে নিয়ে গেছিলো মহাকাশে ইউএফও’র বন্দরে। মাঝে মাঝে কেভিন অনর্গল ভিনগ্রহবাসী আর ইউএফওর অভিজ্ঞতার গল্প করতে থাকে। কেভিনের মতে বোকা মানুষেরা মনে করে এলিয়েন মানুষের মতো দেখতে! বোকারা মনে করে এলিয়েনদের মানুষের মতোই হাত পা চোখ কান আছে! কিন্তু আসলে এলিয়েনরা দেখতে মোটেও হাত পা চোখ কান ওয়ালা মানুষের মতো না! কেভিনের মতে আসলে এলিয়েনরা বা ভিনগ্রহের বাসিন্দারা দেখতে আমাদের ধারণার বাইরে!

তো যা বলছিলাম, মাদাগাস্কারে মাস ছয়েক থেকে কেভিন বাড়ি ফেরে গাদা গাদা ভিনগ্রহী উদ্ভিদের আর লেমুরের স্কেচ এঁকে নিয়ে। সেই থেকেই শুরু কেভিনের মানসিক রোগের। বাড়ি ফিরে আর কোনো কাজে মন বসেনি, জীবিকার তাগিদে একের পর এক পার্ট—টাইম কাজ বদলেছে কিন্তু জীবনে আর থিতু হতে পারেনি। বার বার কেভিনকে যেতে হয়েছে মানসিক হাসপাতালে। বাবা—মায়ের মৃত্যুর পর ছোট এক ভাই আর বোনের সাথেও কেভিন যোগাযোগ কমিয়ে ফেলে। মানসিক রোগের জন্য ডিজ্যাবিলিটি বেনিফিট বা প্রতিবন্ধিতা ভাতা পায়। টাকা পয়সা ঠিক ভাবে খরচ করার জন্য, বা ওর বেনিফিটের টাকার ব্যবস্থাপনার জন্য যে মানসিক ভারসাম্য দরকার তা কেভিনের নেই, তাই সরকার থেকে ওর ভাতার টাকা ব্যবস্থাপনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক বা কংজারভেটর পেয়েছে। কেভিন এখন এই বৃদ্ধ বয়সে এসে মাঝে মাঝে দুঃখ করে বলে ওর নিজের জীবনটা বিফলে গেল। এতটা সময় পার হয়ে গেল কিন্তু কিছুই করতে পারলোনা। তাই এখন কেভিন এলিয়েনদের নিয়ে উপন্যাস লিখছে। আমার কাছে লেখা ইমেইলে ওর উপন্যাসের কিছু অংশ নিজের অজান্তেই শেয়ার করে ফেলে। যেমন সেদিন লিখলো: 

“সুপ্রভাত রওনাক,

সেদিন আপনি আমাকে আমার এলিয়েন অপহরণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমার জীবনে মাত্র তিনটি এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে, একই বহির্জাগতিক এক্সোবায়োলজি স্টাডি গ্রুপের দ্বারা, তাদের একটি চলমান গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। অপহরণের সময়টা কেমন লাগে? খুবই বিরক্তিকর! এলিয়েনদের স্পেস পোর্ট বা বন্দরগুলো থেকে মহাকাশ দেখাটা দারুণ, কিন্তু যখন মহাকাশযানটি আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে চলে (হ্যাঁ, তারা এটা করতে পারে), তখন আমরা বাইরে কিছুই দেখতে পাই না। অপহৃত দলটিতে আমাকে নিয়ে সাতজন ছিল। প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির। প্রত্যেকের নিজস্ব অদ্ভুত জৈব—রাসায়নিক গঠন রয়েছে এবং তারা অন্য এলিয়েনদের খাবার খেতে পারে না, যার মধ্যে আমিও আছি। আমাকে খাওয়ানোর জন্য, ওই এলিয়েন শীপের কর্মীরা আমাকে জঘন্য ডিনার খেতে দেয়, যেগুলো তারা সুপারমার্কেটের বিতরণ কেন্দ্রে কর্মরত রাতের কর্মীদের সম্মোহিত করে চুরি করে আনে। ইউএফও—টি অন্যদের জন্য হিমায়িত শুকনো খাবার মজুত রাখে। এলিয়েনরা অবশ্যই নিজেদের দেশে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলে, কিন্তু মহাকাশযানে তারা একটি সাধারণ ভাষায় কথা বলে, যা তারা আমাকে শেখানোর চেষ্টা করছে। দুর্ভাগ্যবশত, আমি অনেক শব্দ উচ্চারণ করতে পারি না, কারণ কিছু শব্দ অ—মানবীয় ভাষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ভিনগ্রহীরা আমাকে তাদের কোনো একটি নিজ গ্রহে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু তারা অজুহাত দেখিয়ে তা পিছিয়ে দিচ্ছে। হয়তো তারা আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। আজকে এইটুকুই। আশা করি এতে তোমার মন ভালো হবে। সপ্তাহান্ত এবং আগামী সপ্তাহ উপভোগ করো।

ইতি,

কেভিন, মহাজাগতিক রশ্মির ক্ষতচিহ্ন বাহক।” 

নিজেকে ‘মহাজাগতিক রশ্মির ক্ষত চিহ্ন বাহক’ বলে সম্বোধনের কারণ হলো কেভিন বিশ্বাস করে যে এলিয়েনরা ওকে তিন তিন বার ইউএফও’তে করে মহাকাশে ইউএফও’র বন্দরে নিয়ে গিয়েছিলো। আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে ইউএফও’তে করে ভ্রমণের কারণেই ওর কানের পাশে গোটার মতো হয়ে ক্যান্সার হয়েছে।

তো যা বলছিলাম, মানসিক বিভ্রান্তি থেকেই কেভিন সারা দিন অদ্ভুত অদ্ভুত সব ভৌতিক প্রাণীর ছবি আঁকে, আর আজগুবি সব কল্পনা মিশিয়ে সেগুলোর বর্ণনা লেখে। মাঝে মাঝে ওর স্কেচের ছবি তুলে আমাকে ইমেইলে পাঠায়। আমিও ওর উদ্ভট উদ্ভট সব স্কেচের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ওর আর্টের প্রশংসা করি। আমার ওকে লেখা এরকম একটা প্রশংসার ইমেইলের উত্তরে কেভিন লিখেছে “আমার শিল্পকর্ম সম্পর্কে আপনার এমন ইতিবাচক মতামতের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার ইতিবাচক মন্তব্য আমাকে ছবি আঁকিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।...ম্যাজেলান’ (গধমবষষধহ) প্রাণীদের প্রাথমিক স্কেচ বা খসড়া তৈরির সময় আমি মাথায় রেখেছিলাম যে এদের ‘বাই—নোকুলার ভিশন’ বা দ্বিনেত্র দৃষ্টিশক্তি রয়েছে, তাই এদের চোখগুলো একে অপরের বেশ কাছাকাছি হওয়া প্রয়োজন। ঘোড়ার ক্ষেত্রে কিন্তু তা নয়; তাদের চোখ মাথার দুই পাশে থাকে। তাই আমি ব্যাবুনের (এক ধরনের বড় বানর) গঠন পর্যবেক্ষণ করলামÑযাদের দ্বিনেত্র দৃষ্টিশক্তি ও দেখার ক্ষমতা অত্যন্ত প্রখর, অথচ তাদের মুখের গড়ন লম্বা ও অনেকটা কুকুরের মতো হওয়া সত্ত্বেও তা দৃষ্টিশক্তির পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। এছাড়া, নতুন করে সাজানো এই ম্যাজেলানদের আমি দিয়েছি রাতের বেলা দেখার বিশেষ ক্ষমতা এবং বিশাল কালো চোখ, যা তাদের উপস্থিতিকে আরও ভীতিজাগানিয়া করে তোলে। ‘প্লাথগোলিয়ান’ (চষধঃযমড়ষরধহ) এলিয়েনদের দেখার জন্য প্রস্তুত তো?” ...

সাতাত্তর বছর বয়সী প্রবীণ, কেভিনের যত কথা আছে তা ব্যক্ত করে এলিয়েন কাহিনীর পাণ্ডুলিপিতে, আর আমাকে লেখা ইমেইলে। ইমেইলে কেভিন কেবল ঘুরে ফিরে এলিয়েনদের কথা বলে, ওর আঁকা সেই গাছ গাছালির মতো দেখতে, গাছের ডালপালাতে অনেকগুলো চোখ ওয়ালা, উদ্ভট সব স্কেচগুলোর বিবরণ লেখে। এর বাইরে ওর মস্তিষ্কে, মননে কোনো মানুষ, এমনকি বেড়াল, কুকুর বা জাগতিক কোনো প্রাণীর কোনো স্থান নেই! এখন আর কেভিনের কোনো বন্ধু নেই, আত্মীয় নেই। অসামাজিক কেভিন যখন আমার সামনে এসে বসে থাকে তখন কিন্তু তেমন কথোপকথন হয়না। কেভিনের এই নীরব নিস্তব্ধ উপস্থিতি মাঝে মাঝে আমাকেও গ্রাস করে। আমি কথা না খুঁজে পেয়ে ওর দুচোখে নীল রঙের কষ্ট দেখি। আমি কল্পনা করার চেষ্টা করি অনেক বছর আগের সেই বুদ্ধিদীপ্ত কেভিনকে, যে কেভিন সানফ্রান্সিকো বে থেকে মাদাগাস্কারে গিয়ে হারিয়ে যায় ভীনগ্রহবাসীদের জগতে। 

Related Posts