জেন—জি’র আন্দোলন: ভারতে তেলেপোকা, বাংলাদেশে? || আনিস আহমেদ
বিশ্বজুড়েই মানুষ সব সময়ে আশাবাদী থাকে নতুন প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে। নতুন প্রজন্ম মানে ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরঞ্চ ইতিহাসকে পোষণ করে এতে আরও মাত্রা যোগ করা। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ককরোচ পার্টি নামে অসংখ্য শিক্ষার্থী সেখানে যে আন্দোলন চালিয়েছিল তাকে কেউ কেউ ২০২৪’এর কথিত আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করে পুলকিত বোধ করেছেন। কেউ কেউ এমন কথাও বলেছেন যে বাংলাদেশের সেই জুলাইয়ের আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই ককরোচ বা তেলেপোকা আন্দোলন হয়। কতিপয় ব্যক্তি এমন আশাও পোষণ করেন যে এই তেলেপোকা আন্দোলনের ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে কেবল পদত্যাগ করতে বাধ্য হবেন তাই—ই নয়, তিনি দেশ ছেড়ে পালাবেন। তাঁরা হয়ত জানেন না যে ভারতের ৭৯ বছরের ইতিহাসে কোনো সরকারের পতন ঘটেনি অগণতান্ত্রিক উপায়ে। সেখানে প্রতিটি সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী দলটিকে ভারতের জনগণই নির্বাচিত করে ক্ষমতায় আনে; আবার জনগণই যেদিন মনে করবে যে এই সরকারের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি অসহনীয় সেদিন জনগণই ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে বিজেপিকে পরাস্ত করবে । বিজেপি’র বিপরীতে বিসিপি (ভারতীয় ককরোচ পার্টি) এর উত্থান আসলে খানিকটা বিদ্রুপাত্মক। এই তেলেপোকা আন্দোলনের সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারক সূর্য কান্তের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত ১৫ মে তিনি কিছু সক্রিয়বাদী এবং বেকার তরুণদের ‘তেলেপোকা’ এবং ‘সমাজের পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেন। যার ফলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিচারপতি কান্ত পরে বলেন যে তাঁর মন্তব্য আসলে তাদের বিরুদ্ধে যারা নকল ডিগ্রি পাচ্ছে, সকল শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নয়। তিনি বরঞ্চ ভারতের তরুণ—তরুণীদের ‘উন্নত ভারতের স্তম্ভ’ বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু ততক্ষণে ব্যঙ্গরসাত্মক ভাবে বিজেপি’র নাম অনুসরণে বিসিপি বা ভারতীয় ককরোচ (তেলেপোকা) পার্টি রাখা হয় এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলতে থাকে। অবশেষে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগে বাধ্য হলে ‘তেলেপাকারা’ যে যার ঘরে ফিরে যায়। অবশ্য ককরোচরা বলছে যে মামলা প্রত্যাহার না করলে তারা আবার মাঠে নামবে।
তবে তেলেপোকাদের এই আন্দোলনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল, সেই লক্ষ্য অর্জনে সফল হওয়ায় তাদের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের যে তরুণ—তরুণীরা ২০২৪ এর আন্দোলন শুরু করে তাদের প্রকাশ্য লক্ষ্য এবং গোপন লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। প্রকাশ্যে তারা কোটা—বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। ভারতের প্রধান বিচারপতির মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কোটা সংরক্ষণের বিপক্ষে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি—পুতিরা চাকরি পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে?’ শেখ হাসিনার এই তাৎক্ষণিক বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিলকারীরা আবাসিক হলগুলো থেকে বেরিয়ে এসে ‘তুমি কে আমি কেÑ রাজাকার, রাজাকার’, ‘কে বলেছে কে বলেছেÑ স্বৈরাচার’। শেখ হাসিনার ওই মন্তব্য যে খুব বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করেছিল সেটা অন্তত সেই সময়ে মনে হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে এটাই তো প্রমাণিত হলো যে গুপ্ত থাকা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়েত শিবিরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা বিরোধী আন্দোলনের নামে ভিন্ন রকম দাবির ছক কষছিল। সেজন্যেই আমরা লক্ষ্য করলাম যে মুক্তিযোদ্ধাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত কোটা পদ্ধতি কার্যত বাতিল হয়ে যাওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনকে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানোর আন্দোলনে পরিণত করে। অথচ ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ সবরকম কোটা পদ্ধতি বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করেছিল সরকার। সেই পরিপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে আপীল করায় সেটি যখন আদালতে বিচারাধীন তখন ২০২৪ সালের বিক্ষোভ শুরু হয়। হাসিনা ইতোমধ্যেই জানিয়েছিলেন যে পুরো বিষয়টি আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত। কিন্তু ভিন্ন উদ্দেশে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে এই সহিংস বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। তাতে কিছু শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছিলেন সেটা যেমন সত্যি কথা, তার চেয়েও বড় কথা অনেকেই সরকারি আক্রমণে নয় বরঞ্চ কথিত আন্দোলকারীদের গোপন হামলায় প্রাণ হারান। মুগ্ধের মৃত্যুসহ বেশ কিছু মৃত্যুর ঘটনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনও স্নাইপার দিয়ে এই আক্রমণের বিষয়ে বিস্মিত হন। কারণ পুলিশের কাছে ওই পরিমাপের স্নাইপারই ছিল না। যাইহোক এই রকম সহিংস পরিবেশে শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হয়।
শেখ হাসিনার বিদায়ের পরই আমরা লক্ষ্য করলাম যে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিয়েছিল, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, সেই আন্দোলনকারীদের প্রতিষ্ঠিত ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই বঙ্গবন্ধু জাদুঘর (৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি) তিন বার ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হলো, তাঁর স্থাপত্য ভেঙে ফেলা হলো, বঙ্গভবনসহ সকল সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর ছবি সরিয়ে ফেলা হলো এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মুখে কুলুপ দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ, সকল উপদেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে, বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রামকে একটি বোতাম টিপে মুছে দেওয়া হলো। ভারতে তেলেপোকা আন্দোলনে তেমন কিছুই ঘটেনি। ভারতের দীর্ঘকালের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তেলেপোকা নষ্ট করেনি। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নামে ইতিহাস পাল্টে দেয়া, মুক্তিযুদ্ধের অবমূল্যায়ন করার এক মহড়া চলে। কাজেই ভারতের এই তেলেপোকা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ক্ষোভের তুলনা একেবারেই অবান্তর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের তারুণ্য শক্তি যে ব্যাপক আন্দোলন চালায় সেটিও একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে চালানো হয় এবং সেই আন্দোলনের সুফল চলে আসায় আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। বাংলাদেশেও সেই মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য অর্জন করলো স্বাধীনতা বিরোধীরা, যদিও বাহ্যত তারা কোটা আন্দোলনের অজুহাত দেখিয়ে আসছিল।
বাংলাদেশের এই কথিত আন্দোলনকারীরা ছিল বস্তুত গোখরো সাপের মতো, তেলেপোকার মতো লাফালাফি করেনি, লুকিয়ে ছিল, বার বার তাদের ঘোষিত লক্ষ্য বদলিয়েছে এবং অবশেষে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। পুরো ইতিহাসকে গিলে খেয়েছে এই গোখরো সাপ। এই সাপকে দিয়েই আবার আমাদের গিলে খাওয়া ইতিহাস উগলাতে হবে, কারণ সাপ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হজম করতে পারবে না। এই বদ—হজমের কিছু আভাস আমরা এরই মধ্যে পাচ্ছি যখন এনসিপি’র নেতারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁদেরই মিত্র পক্ষ দ্বারা। এই বন্ধুত্ব ক্ষণিকের এবং স্বার্থ দ্বারা প্রণোদিত। তবে এই সাপের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজন একজন বংশীবাদকের।
