যা দেখেছি যা বুঝেছি—১২ || মনিরুল ইসলাম
সবাই সমান?
লিঙ্গ সমতা নিয়ে কতযুগে কতদেশে কতকথা। নর—নারী উভয়েই এক মানবপ্রজাতির অংশ হলেও তারা পুরোপুরি এক নয়, অভিন্ন নয় সুতরাং সমানও নয়। তাহলে সমতা কিভাবে অর্জিত হবে? কিছু পুরুষালি নারী, কিছু মেয়েলি পুরুষ আপাতদৃষ্টিতে সমান হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমান হবে না। যেখানে মানুষে মানুষে সমতা নেই কোথাও, সেখানে নারী পুরুষের সমতা নিয়ে সংগ্রাম করা বিলাসিতা। আগে মানুষের মধ্যে সমতা আসুক, নর—নারীর সমতা তখন এসেই যাবে। আত্মপ্রসাদের জন্য সমতার কথা বলতে পারি। কিন্তু মানুষে মানুষে সমতা আসবে না, সুতরাং নারী—পুরুষেও সমতা আসবে না, আসতে পারে না।
সমলিঙ্গে নিজেদের মধ্যে সব পুরুষ কি সমান, সব নারী কি একে অন্যের সমান? তাহলে সব নারী—পুরুষ কীভাবে সমান হবে? সব পুরুষ কি সব নারীর চেয়ে বেশি অধিকার ভোগ করে? সব নারী কি সব পুরুষের চেয়ে কম কিছু পায়? সকল পুরুষ কি সমান কাজ করে, সকল নারী কি সমান কাজ পাবে? সকল নারী ‘তাদের’ কাজ করুক নির্বিঘ্নে, পুরুষরা ‘তাদের’ কাজ করুক সঠিকভাবেÑএটাই তো সমানাধিকার। কিন্তু তা—ও তো হয় না। সমতা একটি মিসনোমার, প্রকৃতির রাজ্যে সবই অসমান এবং সেই বৈচিত্র্যের নামই ‘সুন্দর’। জোর করে সমান করলে বিকৃতি ঘটবে, সৌন্দর্যের হানি ঘটবে। প্রাকৃতিক কারণে স্বাভাবিক গতিধারায় কিছু পুরুষ এবং কিছু নারী উপরে থাকবে, কিছু নীচে পড়ে যাবে। তবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো নারী বা পুরুষÑযে কোনো মানুষকেই, তার অনিচ্ছায় পেছনে বা সামনে ঠেলে দেয়া যাবে না। নিজ নিজ যোগ্যতায় স্বাভাবিক স্বচ্ছ গতিধারায় এগিয়ে থাকে কেউ কেউ, এখানে নারী—পুরুষের প্রশ্ন আসে না। নারী সমান হবে কেন, পারলে বড় হবে। তাই টিমোথি—লিয়ারি বলেছেন, যেসব নারী পুরুষের সমান হতে চায় তাদের উচ্চাকাঙ্খা নেই অর্থাৎ নর—নারীর মধ্যে রেষারেষি নয়, যার যার সাধ্য মতো নারী—পুরুষ নির্বিশেষে সবাই বিকশিত হবার চেষ্টা করবে।
নর—নারী অন্য কোনো অর্থে কি সমান? আমি পুরুষ, আমি অর্ধেক। আমার বাকি অর্ধেক পূরণ করেছে একজন নারী। আমাদের দুই ভিন্ন সত্তা, তবে আমাদের কিছু জিনিস কিছুটা সমান: ক্ষুধা জীবনতৃষ্ণা বোধ উপলব্ধি। নারী একজন মা, বাবার মেয়ে, একজনের স্ত্রী। নারী তার নারীত্বে, নারীর ভূমিকায় তৃপ্ত গর্বিত গৌরবান্বিত। নারীর এই ভূমিকাকে ছোট করে দেখাই হচ্ছে নারীর অমর্যাদা। নারীর কাজকে সমভাবে সম্মান করাই হচ্ছে সমঅধিকার। দায়িত্ব সমান, সুতরাং অধিকারও। এটা আলোচ্যসূচির অংশই হওয়ার কথা নয়। তবু এসেছে, কারণ, মানুষ পরস্পরকে দমিয়ে রাখতে চায়Ñশুধু পুরুষ নারীকে নয়, সকল পারমুটেশন—কম্বিনেশনে। সামাজিক ভারসাম্যের জন্য এই প্রবৃত্তিটা যেন প্রকট হয়ে না ওঠে, অ্যাবসলিউট না হলেও রিলেটিভ সমানাধিকার যেন রাখা যায়।
কে সমতা প্রতিষ্ঠা করবে, সরকার? আয়রনি হল, কোনো গণতান্ত্রিক সরকার সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। কারণ, অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার ও অধিকতর সুবিধা আদায়ের জন্য প্রত্যেক গ্রুপ নিজ নিজ স্বার্থানুসারে চাপ সৃষ্টি করবে। একমাত্র স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসক সমাজের সিলেক্টিভ কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক কৃত্রিম সমতা সৃষ্টি করতে পারবে। ভলতেয়ার স্বীকার করেছেন যে, ‘একটি রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সমভাবে শক্তিশালী হতে পারে না, কিন্তু তারা সমভাবে স্বাধীন হতে পারে।’ আসলে কি সকল মানুষ সমভাবে স্বাধীন থাকতে পারে?
এই ‘সমানাধিকার’ হল শোষণের আরেকটা রাজনৈতিক স্লোগান, গণসন্তুষ্টির গণবিজ্ঞপ্তি। এটা নীতি—ধর্ম—শাস্ত্রের বাণী হতে পারে কিন্তু বাস্তব জীবনে ভিন্নচিত্র ফুটে ওঠে প্রকাশ্যে। একদিকে সমান হলে, অন্যদিকে অসমান যেন ঢেউ খেলে যায়। মার্কিন লেখক ইমার্সন তাই লিখলেন, ‘কিছুলোক সর্বদাই অন্যের উপরে থাকবে। আজকে অসমতা দূর করলে কালকেই তা আবার জেগে উঠবে।’ সেজন্যই পৃথিবী থেকে দাসত্ব নিপীড়ন বিলাসিতা চলে যাবে না কোনোদিন। আধুনিক বুদ্ধিমান মানুষকে খুশি রাখার জন্য অধিকতর বুদ্ধিমানেরা বলে, আমরা সবাই সমান। আসলে তারা পণ্যের যেমন ধরনবিন্যাস করে (পধঃবমড়ৎরুধঃরড়হ), মানুষেরও তেমনি শ্রেণীভেদ (পষধংংরভরপধঃরড়হ) করেÑএকটাতে লেবেল এঁটে দেয়, আরেকটাতে উহ্য রাখে। সমতা প্রতিষ্ঠার নামে সবাইকে সুখী নয়, অসুখী করেছিল কম্বোডিয়ার খেমারুজ সরকার। তাই সাধারণ সমতার ক্ষেত্রে স্যামুয়েল জনসন মনে করেন, সমাজের কেউ সুখী না হওয়ার চেয়ে কিছু লোক অসুখী হলে মন্দ কি।
অনেকের মতে, মাঝখানে যা—ই থাক, জন্মে ও মৃত্যুতে আমরা সবাই সমান। জন্ম—মৃত্যু সমান, বাকি সব অসমান। তবে বাস্তবে দেখা যায় অর্থের কারণে জন্ম—মৃত্যুর আগে—পরেও মানুষে মানুষে অসমান সুবিধাদি প্রাপ্ত হয়। ধনীলোকের সন্তান গর্ভে থাকতেই মায়ের মাধ্যমে ভাল খাবার পায়, জন্মের সময়ও তার যত্ন—খেয়াল বেশি। মৃত্যুর সময় এবং মৃত্যুর পরেও সসম্মানে সমাহিত হয় বিত্তের জোরে।
অনেকে আবার ভিতরে সমান হলেও বাইরে অন্তত বোঝাতে চায়, ‘আমিই বড়’। পরিচয়ের প্রথমক্ষণেই আমরা তাই মানুষটার ‘ওজন’ মাপি এবং জানতে চাই/ জানাতে চাইÑকে কত বড়। ‘কোথায় থাকেন, কী করেন’ জানার পর তদানুসারে আচরণ শুরু হয়। একটি আড্ডায় কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রমাণ হয়ে যায় কে বড়, কে ছোট: কে বক্তা, কে শ্রোতা। তার সম্পত্তি প্রতিপত্তি চালচলন ব্যবহার কথাবার্তা মনোভাব তার ‘সাইজ’ ঠিক করে দেয়।
প্রত্যেকেই চায় সবচেয়ে উঁচু স্থানÑবড় সুন্দর দামি জিনিসটা। এই ‘সবচেয়ে’ ধারণা বলে দেয় সবাই উপরে উঠতে/বড় হতে চায়। কয়েকটা পরিচিত বাক্য: ‘কী করবে আমার? আমিও কম কী? আমাকে কী পেয়েছে/ভেবেছে? দেখাব মজাটা। দেখি সে কতবড় হয়েছে। দেখি তার দৌড় কদ্দূর...।’ এসবের মানে হল কেউ কারো সমান একথা মানতেই চায় না। মূলকথা: কেউ ছোট, কেউ বড়।
