রাজনীতি মোকাবিলা করতে হবে রাজনীতি দিয়েই || জাহীদ রেজা নূর

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে নিয়ে কেন এত ভয় চব্বিশের সাহসী অভ্যুত্থানকারীদের? রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে তো মোকাবিলা করতে হয় রাজনীতি দিয়েই। . ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য সেটা করেনি। তাদের শাসনামলের দেড় বছর এমন সব নির্মমতার জন্ম দিয়েছে, যা স্বল্প সময়ে নির্যাতনের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসা সেই সরকার যেখানেই হাত দিয়েছে, সেখানেই ভজকট বাধিয়েছে। অধ্যাপক ইউনূসের তরুণ নিয়োগকর্তারাও পেয়েছিল ক্ষমতার ভাগ। এই নিয়োগকর্তা বামেটিকুলাস ডিজাইনেরহোতাদের নিয়েও দেশের মানুষের মনে একসময় নানা প্রশ্নের জন্ম হতে শুরু করে। গণআন্দোলনের ফল হিসেবে ক্ষমতায় বসা কোনো সরকার মাত্র দেড় বছরের মধ্যে জনগণকে এতটা ক্ষুব্ধ হতাশ করতে পারে, রকম নজির মনে হয় বিশ্বে খুব একটা নেই।

২০২৪ সালকে আমাদের ইতিহাসের একটি বড় বাঁক পরিবর্তনের বছর হিসেবে ধরতে হবে। এটি এমন এক বাঁক পরিবর্তন, যার উৎস সন্ধানে মানুষ আরও বহুদিন ব্যাপৃত থাকবে। কারণ, এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, অংশগ্রহণে এত বেশি বৈচিত্র্য ছিল যে, এককথায় তার কোনো মূল্যায়ন হওয়ার পথ নেই। স্বৈরশাসনের পতন দেশবাসীকে স্বস্তি দিয়েছিল। তাদের যে নতুন দিনের আশার বাণী শোনানো হলো, তাতেও ভরসা করতে চেয়েছিল আমজনতা। কিন্তু ক্ষমতা হাতে পেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তাঁর গ্রামীণ সাম্রাজ্য নিয়ে যে কাণ্ডকারখানা করেছেন, সেটাই হয়তো সেই সময়ের সবচেয়ে বড় পোস্টার। নিজের স্বার্থ রক্ষা করেছেন তিনি কোনো দিকে না তাকিয়ে। তাঁরই দেখানো পথ ধরে এগিয়েছে গোটা সরকার। তাতে জনগণের প্রাপ্তি কতটা ছিল? সেটাও এখন গবেষণার ব্যাপার।

দিনবদলের প্রত্যাশা জাগিয়ে যারা চব্বিশের সাফল্যকে দখল করে নিল, তারা আসলে কারা? তারা কি দেশের সম্মিলিত জনসমষ্টির প্রতিনিধিত্ব করে? আন্দোলনের বীজ কারা বপন করল? কারা সে বীজকে বাঁচিয়ে রাখল? আর কারা ফসল তুলল? এদের সবাই কি এক, নাকি ভিন্ন ভিন্ন মানুষ? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে ভজকট বাধানোর ব্যাপারে টাকাপয়সার যে আলোচনা নিয়ে এসেছিলেন, সেই কথিত টাকার ভাগ কারা কীভাবে পেয়েছিলেন? অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে যে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করেছিল, সে কমিশনগুলোর প্রধান রূপে কারা নিয়োগ পেয়েছিলেন? তাঁদের অনেকেই বিদেশি পাসপোর্টধারী হওয়ার কারণ কী? যুক্তরাষ্ট্র থেকে কারা উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলেন বিভিন্ন কমিশনে? নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনটি রিপোর্ট দেওয়ার পরপরই তা হিমঘরে চলে গেল কেন? মামলাবাণিজ্যের রমরমা হওয়ার পেছনে ইন্ধন দিল কে বা কারা? কোন জোশে ক্রীড়ামোদীদের হতাশ করে বিশ্বকাপ থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে? সেটা কি দেশের ক্রিকেটের জন্য ইতিবাচক কোনো বার্তা দিতে পারল? রকম প্রশ্ন একটার পর একটা করে গেলেও প্রশ্নমালা ইলাস্টিকের মতো বড়ই হতে থাকবে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের উল্টাপাল্টা কর্মকাণ্ডের লেখাজোকা নেই। মাটির অনেক গভীরে গিয়ে শিকড় গেড়েছে সেগুলো। এই লজ্জা থেকে জাতি কখনোই মুক্তি পাবে না।

.

সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন একেবারে শেষ দিকে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক দফার আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। হাসিনা সরকারের টানা তিন মেয়াদের শাসনে নানা কারণে ক্ষুব্ধ, হতাশ সাধারণ মানুষের বড় অংশের সমর্থনও পেয়েছিল তা। জুলাইআগস্টের অভ্যুত্থানে শ্রমিকসহ অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ, রাস্তায় নামা স্কুলপড়ুয়া শিশুদের প্রাণ যাওয়া তার অন্যতম প্রমাণ। কিন্তু তখনকার কিছু ঘোলাটে বিষয়ও এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। আরও অনেক কিছু আছে, সেগুলোও হয়তো পরিষ্কার হবে। ঘুরেফিরে সেই রহস্যময় বুলেটের প্রসঙ্গ আসবে। উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন যে বুলেট নিয়ে মুখ খুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হারিয়েছিলেন, সেই বুলেটের বিষয়টি কি খোলাসা হবে না? আর ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙার বিষয়টি নিয়েও কি কথা হবে না? গত শতকের ষাটের দশক থেকে যে বাড়িটি ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধিকার আন্দোলনের তীর্থকেন্দ্র, সেই বাড়িটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার যে মতলববাজি ষড়যন্ত্র ছিল, তার নটনটী কারা ছিল, সে প্রশ্ন কি করবে না জনগণ? আর নির্বিচার মামলাবাণিজ্য কাদের পকেটকে স্ফীত করেছিল, সে হিসাবও কি জনগণ একদিন নেবে না? বদলিবাণিজ্যের অভিযোগ নিয়েও তো ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠা থাকবে। দরবেশদর্শন সেই যুবক এখন কোথায় আছেন? পাঠ্যপুস্তকসংক্রান্ত অপবাদের কোনো সুরাহা কি হলো? হবে কোনো দিন?

নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এত বড় একটি চুক্তি কোন বিবেচনায় করল ইউনূস সরকার, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে কখনো? কেউ কেউ বলছেন, এই চুক্তির ব্যাপারে নাকি বিএনপিজামায়াতেরও সমর্থন ছিল। তা কতটা সত্যি? এসব প্রশ্ন নিয়ে কি দেশের মানুষ ভাবছে না?

এভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করা যাবে অন্তহীন। তাতে কোনো লাভ হবে কি? সংশয়ের কারণ, নিয়ে দৃশ্যত কারোরই আর মাথাব্যথা নেই।

.

চব্বিশের গণআন্দোলন সফল হওয়ার পর মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ বহুদিনের জন্য পিছিয়ে পড়ল। কিন্তু দলটির নিরীহ নেতাকর্মীদেরও নির্বিচারে জেলে ঢোকানো, সমর্থককর্মীদের বাড়িঘরে হামলা, বাবামায়ের মৃত্যুতেও প্যারোল না হওয়ার মতো ঘটনা জনগণের নজর এড়ায়নি। সামাজিক মাধ্যমে এগুলো নিয়ে কথার ঝড় উঠেছে। এতে রাজনীতির মাঠে ধরাশায়ী হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ জনপরিসরে আলোচনায় থেকে গেছে। দেশিবিদেশি পর্যবেক্ষক মহল গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্তির স্বার্থে সুনির্দিষ্ট অপরাধীদের বিচার সাপেক্ষে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে আহ্বানে কাজ হয়নি। টানা কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ ব্যাপকভাবে নিন্দিত। নির্বাচনের আগে অনেকেই বলেছেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের একটির ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না রাখাও অগণতান্ত্রিক। সেটাও এক হিসাবে আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচনের মতোই কাজ।

ইউনূস আমলে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেলিনা হায়াৎ আইভীকে জেলে পোরা হলো। বারবার জামিন পাওয়ার পরও তাঁকে ছাড়া হয়নি। আওয়ামী লীগ গায়ের জোর খাটাতে গিয়ে জনগণের কাছ থেকে যে জবাব পেয়েছে, সেটা কি কারও মনে নেই? জনগণকে বোকা মনে করে কুছ পরোয়া নেই কায়দায় রাজনীতির মাঠ দখল করে রাখলে কোন পথে যে পরিবর্তন আসে, তার নজির ইতিহাসজুড়ে রয়েছে।

.

যত দিন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকা সম্ভব ছিল, তত দিন মাহফুজ আলম সেই সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। এরপরই কেবল তিনি পদত্যাগ করেছেন। উপদেষ্টা থাকাকালে তিনি এক অদ্ভুত কাজ করতেন। ফেসবুকে কোনো স্ট্যাটাস দিয়ে কিছু সময় পরেই তা মুছে ফেলতেন। কেন এমন করতেন, তার উত্তর তিনিই জানেন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য ফিরে আসা নিয়ে তিনি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেই স্ট্যাটাস নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে তুমুল তর্কবিতর্ক চলছে। স্ট্যাটাসে মাহফুজ কী লিখেছেন, তা নিয়ে কথা না বলে এটাই বলা উচিত, তিনি যা বোঝাতে চেয়ে থাকুন না কেন, তাঁর স্ট্যাটাসের প্রতিটি বাক্যে ফুটে উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের চিত্র, ধর্মীয় উগ্রপন্থী আর স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্ফালনের চিত্র।

মাহফুজ আলম নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখবেন, বঙ্গভবন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে ফেলা বাজুলাইয়ের চেতনাবেঁচে থাকা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে কোথাও দেখা যাবে না ধরনের বক্তব্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক রাখার ক্ষেত্রে তাঁর নিজের অবদানও কম নয়।

.

আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, ক্ষমতায় যাওয়ার পর কেউ আর জনগণকে ক্ষমতার উৎস বলে মনে করে না। নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকেই তখন ক্ষমতার উৎস হিসেবে দেখা হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ আগেও পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু তা কাজে লাগায়নি। তাই কে ক্ষমতায় এল, কে গেল, তাতে শেষ পর্যন্ত দেশের আপামর জনগণের কোন উপকার হবে, তা কি কেউ বলতে পারেন? কথামালার রাজনীতিই কি শেষ পর্যন্ত আমাদের নিয়তি?


Related Posts