ক্লান্ত ট্রাম্প, সংকটে আমেরিকা || ড. জীবন বিশ্বাস

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরটি সম্ভবত কোনো দূরদর্শী কূটনীতির স্মারকস্তম্ভ হয়ে ইতিহাসে জায়গা পাবে না। বরং একে মনে রাখা হবে একদা একচ্ছত্র আমেরিকার বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক চরম আত্মবিস্মৃতির দৃশ্যপট হিসেবে। হোয়াইট হাউজ অবশ্য যথারীতি ঢাকঢোল পিটিয়ে এই সফরকে এক ঐতিহাসিক মহাবিজয় হিসেবে জাহির করতে ছাড়েনি। তাদের খেরোখাতায় জমার অঙ্কে লেখা হয়েছে, চীনের ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি, মার্কিন গোমাংসের জন্য চীনা বাজারের অর্গল উন্মোচন, পোলট্রি আমদানির জট ছাড়ানো এবং নিত্যনতুন বাণিজ্য বিনিয়োগের মোহময় রূপরেখা। কিন্তু ওয়াশিংটনের এই আত্মতুষ্টির বাইরে, খোদ জাতিসংঘের সদর দফতর থেকে আসা মূল্যায়নটি ছিল অনেক বেশি রূঢ় বাস্তবসম্মত। সংবাদসংস্থা রয়টার্সেও ভাষ্যমতে, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ট্রাম্পশি করমর্দন বিশ্বমঞ্চের স্নায়ুচাপ কিছুটা প্রশমিত করলেও, কোনোবড় ধরনের অগ্রগতিএনে দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে, খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা মার্কিনচীন বাণিজ্যবোঝাপড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধোন্মাদের মেঘ কাটানোর ক্ষেত্রে এই সফর কোনো আলোর দিশা দেখাতে পারেনি। প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।

চটকদার শিরোনাম বনাম নির্মম লেভারেজ

এই বৈপরীত্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আসল সত্য। টেবিলের তলায় চটজলদি কিছু লেনদেনের চুক্তি হয়তো সাময়িক রাজনৈতিক ফায়দা দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সুদূরপ্রসারী কৌশলগত বিজয়ের সমার্থক নয়। প্রায় এক দশক পর বোয়িংয়ের ঝুলিতে চীনের এই বিশাল অর্ডার বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিঃসন্দেহে লোভনীয়। কিন্তু এর বিনিময়ে বেইজিং সুচতুরভাবে আদায় করে নিয়েছে বিমানইঞ্জিন খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের মার্কিন নিশ্চয়তা। অর্থাৎ, এতদিন যাবৎ ওয়াশিংটন যেশিল্পলিভারেজবা প্রযুক্তিগত একাধিপত্যকে চীনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল, এবার তাতেই আমেরিকার হাত বেঁধে দেওয়া হলো। প্রধান শিরোনামের পেছনে যে জাঁকজমকপূর্ণ বিজয়ের গল্প ফাঁদা হয়েছে, তার অন্দরে আসলে লুকিয়ে ছিল এক নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ। চীন বিমান কিনল বটে, কিন্তু তার বিনিময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সবচেয়ে স্পর্শকাতর চাবিকাঠিটি নিজের পকেটে পুরে নিল।

মূল সংকটটি আরও গভীর। ট্রাম্প বেইজিংয়ের মাটিতে পা রেখেছিলেন চীনা ড্রাগনকে বশ করার এক অদ্ভুত অহমিকা নিয়ে, কিন্তু ফেরার বিমানে চাপলেন কেবল এক পশলা আবহ সৃষ্টির সান্ত্বনা বগলে করে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এক অদ্ভুত দৃশ্যপট ফুটে উঠেছেঃ তিন দিনের এই সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেখা গেছে নজিরবিহীনভাবে ম্রিয়মান নীরব। অথচ আলোচনার টেবিলজুড়ে তখন ফুঁসছিল তাইওয়ান, প্রযুক্তিযুদ্ধ ইরানের মতো জ্বলন্ত সব ইস্যু। বিপরীতে, শি জিনপিং চাল চাললেন অত্যন্ত ধারালো মাপা চালে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিলেনঃ তাইওয়ান প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ভুল চাল দিলে দুই পরাশক্তির সংঘাত অনিবার্য। ট্রাম্পের এই সংযত, প্রায় আড়ষ্ট সংবাদসম্মেলনভঙ্গি প্রমাণ করে, সস্তা ব্যক্তিনির্ভর চমকপ্রদ কূটনীতি আজ এক দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্রেসিডেন্সির রূপক মাত্র। নেতার শরীরের এই দৃশ্যমান ক্লান্তি হয়তো কোনো রাষ্ট্রনীতির দলিল নয়, কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে যখন ফলাফলের খাতা শূন্য থাকে, তখন এই অবসাদই হয়ে ওঠে ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের প্রতীক।

বেইজিংমস্কো অক্ষ এবং প্রাচ্যের নতুন সমীকরণ

বিশ্বনাটকের দ্বিতীয় অঙ্কটি মঞ্চস্থ হলো এর মাত্র কয়েক দিন পরেই। এবার বেইজিংয়ের লাল গালিচায় শি জিনপিং পরম উষ্ণতায় বরণ করে নিলেন ক্রেমলিনের প্রতিভূ ভস্নাদিমির পুতিনকে। ঘোষণা করা হলো চীনরাশিয়া মৈত্রী আজইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরেঅধিষ্ঠিত। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানাচ্ছে, দুই রাষ্ট্রপ্রধান কেবল করমর্দন করেই ক্ষান্ত হননি, তারা স্বাক্ষর করেছেন প্রায় ৪০টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাচুক্তি। জ্বালানি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বাণিজ্যের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বোনা হলো যৌথ উদ্যোগের জাল। মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত আবহে পুতিন নিজেকে রাশিয়ার এক নির্ভরযোগ্য চিরস্থায়ী জ্বালানিসহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করলেন। ট্রাম্প যে ভূরাজনৈতিক অক্ষটিকে ভেঙে চুরমার করতে চেয়েছিলেন, তা যেন আরও ইস্পাতকঠিন হয়ে ধরা দিল।

তবে কথাও অনস্বীকার্য যে, চীন রাশিয়ার এই মধুচন্দ্রিমা সম্পূর্ণ কাঁটাহীন নয়। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, বহু চর্চিতপাওয়ার অব সাইবেরিয়া গ্যাস পাইপলাইনের চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে পুতিন শি কোনো জাদুকরি ঘোষণা দিতে পারেননি; খুঁটিনাটি অনেক হিসাবনিকাশ এখনও অমীমাংসিত। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা হিমশৈলের চূড়ামাত্র, যা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতীকটিকে ম্লান করতে পারে না। ট্রাম্পের সফর যেখানে শেষ হলো খুচরো কিছু বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতিতে, সেখানে শিপুতিন বৈঠক থেকে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘ, তাত্ত্বিক যৌথ ইশতেহার। যেখানে মার্কিন একতরফা মোড়লগিরির তীব্র সমালোচনা করা হলো, হুঁশিয়ারি দেওয়া হলোজঙ্গলের আইন’— ফিরে যাওয়ার আশঙ্কার বিরুদ্ধে, এবং সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছোঁড়া হলো আমেরিকারগোল্ডেন ডোমক্ষেপণাস্ত্রপ্রতিরক্ষা প্রকল্পের মতো কৌশলগত দম্ভকে।

ইরান সংকট এই বৈপরীত্যকে আরও নগ্ন করে তুলেছে। ট্রাম্পের হুঙ্কার বরাবরই এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে, কেবল অন্ধ চাপ নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েই প্রতিপক্ষকে হাঁটু গেড়ে বসানো যায়। অথচ রয়টার্স জানাচ্ছে অন্য কথাÑইরান শান্তিচুক্তির অনিশ্চয়তার যাঁতাকলে পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে আকাশচুম্বী হয়েছে। ওদিকে বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের একপঞ্চমাংশের লাইফলাইনহরমুজ প্রণালিকার্যত অবরুদ্ধ। ইরান এখন ওমানের সাথে মিলে এই প্রণালির সমান্তরাল নিরাপত্তা বলয় গড়ার বন্দোবস্ত করছে, আর ওয়াশিংটন ব্যস্ত ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অর্থহীন নিষেধাজ্ঞার জাল বুনতে। এগুলো কোনো সমাধানের লক্ষণ নয় বরং এক চিরস্থায়ী সংকটের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

অভ্যন্তরীণ রণাঙ্গন: প্রতিশ্রুতি মোহভঙ্গ

বিদেশের এই কূটনৈতিক চোরাবালি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের সস্তা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াচ্ছে। তিনি বুক চাপড়ে বলেছিলেন, রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধ নাকি মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্ধ করে দেবেন! কূটনীতির নির্মম বাস্তবতার চপেটাঘাতে সেই হুঙ্কার আজ ঠান্ডা ঘরে বন্দি। ঠিক একই রকম মোহভঙ্গ ঘটেছে সাধারণ মার্কিনীদের অর্থনৈতিক জীবনেও। ট্রিপল (অঅঅ)—এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান সংকটের আঁচ লাগায় মাত্র এক মাসের ব্যবধানে (২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ মার্চ) গ্যালনপ্রতি পেট্রলের দাম .৯৮ ডলার থেকে লাফিয়ে .৯৮ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারিতে আবাসিক বিদ্যুতের বিল গত বছরের তুলনায় . শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্লোগানের রোশনাই দিয়ে সাধারণ মানুষের চুল্লির আগুন নেভানো যায় না।

আমেরিকান মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার এই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে ঋণের পাহাড়। নিউইয়র্ক ফেডের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই মার্কিন পারিবারিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১৮. ট্রিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে কেবল ক্রেডিট কার্ডের ঋণই .২৫২ ট্রিলিয়ন ডলার, এবং বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে .১০ শতাংশে পৌঁছেছে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার ১০ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার যে লোভনীয় টোপ দিয়েছিলেন, তা আজ মার্কিন আইনসভার অলিন্দে অর্থলিপ্সু ব্যাংকিং খাতের তীব্র বিরোধিতার মুখে হিমাগারে শায়িত।

সংসার সমাজনীতির ক্ষেত্রেও এই ব্যর্থতার খতিয়ান দীর্ঘ। আইভিএফ (ওঠঋ) চিকিৎসার খরচ কমানোর যে চটকদার আশ্বাস ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তাঁর মহামূল্যবানএক্সিকিউটিভ অর্ডারবা নির্বাহী আদেশ তার কোনো বীমা বা সরকারি ভর্তুকির নিশ্চয়তা দিতে পারেনি; বরং তা কেবল কিছু নীতিসুপারিশের কমিটি গঠনেই থমকে গেছে। একইভাবে, প্রবীণদের মন জয়ের জন্য আনাওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্টকিছু সাময়িক কর ছাড় দিলেও, নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, তা সোশ্যাল সিকিউরিটির মূল ট্যাক্সের ভার থেকে আমেরিকার প্রবীণদের বিন্দুমাত্র মুক্তি দিতে পারেনি।

ক্ষমতার সীমানা এক পরিবর্তিত বিশ্ব

ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত গড়ে উঠেছে এক উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি, অতিসুরক্ষা এবং হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের মিথের ওপর।এপি ভোটকাস্ট’—এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রায় দশজনের মধ্যে আটজন শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান ভোটার ট্রাম্পের ঝান্ডার নিচে জড়ো হয়েছিলেন, যারা মোট ভোটারের প্রায় একপঞ্চমাংশ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষা বলছে, ২০২৫ সালের শুরুতে এই রক্ষণশীল গোষ্ঠীর ৭২ শতাংশ তাঁর কাজের প্রতি অন্ধ সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, ধর্মীয় জাতিগত আবেগের সস্তা সুড়সুড়ি দিয়ে যুদ্ধ, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা আর পঙ্গু হয়ে যাওয়া শাসনব্যবস্থার বাস্তব ক্ষত উপশম করা যায় না।

একই সাথে সাংবিধানিক আইনের শাসনের প্রশ্নটিও আজ কাঠগড়ায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কোণঠাসা করার জন্য ট্রাম্পের জারি করা নির্বাহী আদেশের বিষয়ে মার্কিন বিচার বিভাগের নজিরবিহীন দোদুল্যমানতা কখনও পিছু হটা, কখনও বা আবার তা নতুন করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আসলে এক গভীর সাংবিধানিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন সংবিধানের পাতা মনে করিয়ে দেয়, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সুদূরপ্রসারী হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই অসীম নয়। দেশের আদালত, আমলাতন্ত্র এবং স্বয়ং প্রশাসনের খোদ আইনজীবীরাই যখন নির্বাহী আদেশের আইনি ফাঁকফোকর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন একনায়কতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের দম্ভ চূর্ণ হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের কঙ্কালটি বেরিয়ে পড়ে।

উপসংহার

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর মার্কিন সাম্রাজ্যের এক মৌলিক আত্মবিরোধিতাকেই নগ্ন করে দিয়েছে। ট্রাম্পের রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বাসের ওপর যে, একজনস্ট্রংম্যানবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্বই সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক গলদের সমাধান। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বাস্তব বড় কঠিন। চীনের কূটনীতি অত্যন্ত ধৈর্যশীল সুদূরপ্রসারী, রাশিয়ার বেইজিংনির্ভরতা আজ অনড়, ইরান হরমুজ প্রণালিকে বানিয়ে ফেলেছে এক স্থায়ী দাবার ঘুঁটি, আর আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কোনো জাদুমন্ত্রের তোয়াক্কা করছে না।জঙ্গলের আইননিয়ে শি জিনপিংয়ের সাবধানবাণী হয়তো চতুর চীনা স্বার্থেরই অংশ, কারণ দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নিজেদের দাদাগিরিও কম নয়। তবুও পৃথিবী আজ মার্কিনকেন্দ্রিক একক অক্ষের বৃত্ত ভেঙে এক রুক্ষ, কঠোর এবং দ্বিপাক্ষিক লেনদেনের বহুমুখী মঞ্চে প্রবেশ করেছে। পরিণামটি কেবল বেইজিংয়ের মাটিতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি আসলে এক ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন আধিপত্যের ঐতিহাসিক দলিল। কোনো পরাশক্তিই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের বিকল্প হিসেবে কেবল নাটকীয় আত্মবিশ্বাস বা মেকি দম্ভকে খাড়া করে টিকতে পারে না। কয়েকটা বোয়িং বিমানের অর্ডার বা গোমাংসের বাজার মার্কিন শিল্পপতিদের পকেট ভরাতে পারে, কিন্তু তা যুদ্ধ থামাতে পারে না, জ্বালানি বাজারকে শান্ত করতে পারে না, আইনি ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে না, কিংবা সাধারণ মার্কিন ভোটারদের এই আশ্বাস দিতে পারে না যে নেতার মুখের ফাঁকা বুলি শেষ পর্যন্ত নীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বেইজিংয়ের দরবারে ট্রাম্প গিয়েছিলেন এক দিগ্বিজয়ী বীরের মুকুট পরতে কিন্তু বিদায়বেলায় তাঁর কপালে জুটল এক পরিবর্তিত, নির্মম নতুন পৃথিবীর কঠোর অনুশাসন। আমেরিকার আত্মার আত্মজিজ্ঞাসা এখন জরুরি; কোথায় সেই স্বপ্নের আমেরিকা, কোথায় সেই গণতন্ত্রের প্রথিত স্তম্ভ, কোথায় সেই বৈচিত্র্য সমতার অন্তর্ভুক্তির বিচরণ ক্ষেত্র?


Related Posts