কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—১০ মুদ্রার ক্যানভাসে বিশ্ববরেণ্য বীরাঙ্গনা || আখতার আহমেদ রাশা

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকনোট সংগ্রহের নেশা আমাকে কেবল মুদ্রার বৈচিত্র্য নয়, বরং ইতিহাসের গভীরেও ডুব দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আমার অ্যালবামের প্রতিটি ব্যাংকনোট নিছক মুদ্রামান নয়, বরং ইতিহাসের একেকটি জীবন্ত প্রেক্ষাপট। এর সূক্ষ¥ রেখায় আর রঙের আস্তরণে আমি খুঁজে পাই একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং স্বাধীনতা অর্জনের স্পন্দন। আমার নিয়মিত সিরিজের এই পর্বে বিশ্বের তিনজন নির্ভীক নারীর লড়াইয়ের গল্পগুলো লিখতে গিয়ে বারবার একজনের কথা মনে পড়ছিলÑআমাদের চট্টগ্রামের সেই বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

কলাম্বিয়ার ২০০১ সালের ১০,০০০ পেসোসের নোটে আমরা যাকে দেখি, তিনি পোলিকার্পা সালাভারিয়েতাÑযাকে ভালোবেসে সবাই ডাকতলা পোলা তাঁর গল্পটি কোনো সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। ১৮শ শতাব্দীতে যখন নারীদের কেবল অন্দরমহলে থাকার শিক্ষা দেওয়া হতো, তখন ২২ বছরের এই তরুণী দর্জি পেশার আড়ালে স্প্যানিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। সেই প্রতিকূল সময়ে পোলিকার্পা রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নিয়ে এবং দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে দেশপ্রেম বীরত্ব লিঙ্গভেদে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি আজ লাতিন আমেরিকার নারীবাদী অ্যাক্টিভিস্টদের কাছে এক বড় প্রেরণা। পেশায় দর্জি এই তরুণী সুঁইসুতার আড়ালে বুনেছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন। রাজকীয় পরিবারগুলোতে কাপড় সেলাইয়ের সুযোগে তিনি সংগ্রহ করতেন গোপন সংবাদ এবং পৌঁছে দিতেন বিপ্লবীদের কাছে। ১৮১৭ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে যখন তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানো হয়, তখন তিনি নতি স্বীকার না করে সমবেত জনতার উদ্দেশে স্বাধীনতার জয়গান গেয়েছিলেন। তিনি কেবল কলাম্বিয়ার বীরাঙ্গনাই নন, বরং লাতিন আমেরিকার প্রতিটি নারীর জন্য এক অদম্য সাহসের প্রতীক। 

২০০৩ সালের জামাইকার ৫০০ ডলারের নোট হাতে নিলে প্রথমেই চোখে পড়ে এক দৃঢ়চেতা নারীর মুখÑতিনি ন্যানি অব দ্য ম্যারুনস। পশ্চিম আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারী কেবল একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত আতঙ্ক। জামাইকার দুর্গম ব্লু মাউন্টেনে তিনি গড়ে তুলেছিলেনন্যানি টাউন’, যা ছিল মুক্তিকামী মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। শোনা যায়, তিনি তার কৌশল আধ্যাত্মিক শক্তি (ঙনরধ) দিয়ে ব্রিটিশদের বারবার পরাজিত করেন। তিনি যে ব্লু মাউন্টেনের দুর্গম এলাকায়ন্যানি টাউনগড়ে তুলেছিলেন, তা ছিল স্বাধীনতার এক দুর্গ। তিনি পাহাড়ের ওপর থেকে ব্রিটিশ সৈন্যদের ওপর নজর রাখতেন এবং অতর্কিত গেরিলা হামলা চালিয়ে ক্রীতদাসদের মুক্ত করে আনতেন। তাঁর এই রণকৌশলগুলোই এক অসামান্য নেতৃত্বের স্বাক্ষর বহন করে। তিনি এবং তার বাহিনীর লড়াইয়ের ফলে ব্রিটিশরা ১৭৩৯ সালে মারুনদের সাথে একটি শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হয়, যা তাদের স্বাধীনতা ভূমি প্রদান করে। আজ তিনি জামাইকার ইতিহাসের একমাত্র নারীন্যাশনাল হিরো’—যাঁর স্মৃতি প্রতিটি ৫০০ ডলারের নোটের মাধ্যমে দেশটির মানুষের হাতে হাতে ঘোরে। জামাইকার ইতিহাসে আজ পর্যন্ত তিনিই একমাত্র নারী যাকে 'ঘধঃরড়হধষ ঐবৎড়রহব' এবং 'জরমযঃ ঊীপবষষবহঃ' খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে। 

সবশেষে আসি ডোমিনিকান রিপাবলিকের ২০০ পেসোসের নোটে। এখানে আমরা দেখি তিন বোনকেপ্যাট্রিয়া, মিনার্ভা এবং মারিয়া তেরেসা। ডোমিনিকানরা তাঁদের চেনেলাস মারিপোসাসবা প্রজাপতি নামে। ডমিনিকান রিপাবলিকের কুখ্যাত স্বৈরশাসক ট্রুজিলোর অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা ছিলেন অদম্য। বিশেষ করে মেজ বোন মিনার্ভা ছিলেন এই আন্দোলনের মধ্যমণি। জেলজুলুম আর অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেও তাঁরামুভমেন্ট অফ দ্য ফোরটিন্থ অব জুননামক একটি গোপন সংগঠনের মাধ্যমে দেশজুড়ে প্রতিরোধের ডাক দেন। এই আন্দোলনে তাঁদের গোপন সাংকেতিক নাম ছিললাস মারিপোসাসবা প্রজাপতি। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর জেলখানায় স্বামীদের দেখে ফেরার পথে তাঁদের গাড়ি থামিয়ে অপহরণ করা হয়। এরপর শ্বাসরোধ করে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। ঘটনাটিকেদুর্ঘটনাহিসেবে সাজাতে শেষে গাড়িটি খাদে ফেলে দেওয়া হয়। ঘাতকের আঘাত তাঁদের স্তব্ধ করতে চাইলেও, ইতিহাসের পাতায় তাঁদের এই চরম আত্মত্যাগ এক অক্ষয় অম্লান মহিমা দান করেছে। ঘাতকের আঘাতে ঝরে পড়া সেইপ্রজাপতিরা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে স্বাধীনতার দূত; আর তাঁদের রক্তই ডোমিনিকান রিপাবলিকে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়। আজ কেবল সেই দেশেই নয়, বরং সারা বিশ্বে তাঁদের আত্মোৎসর্গের দিনটিকে পালন করা হয়আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন নির্মূল দিবসহিসেবে। কাগজের মুদ্রায় তাঁদের এই উপস্থিতি আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন প্রতিবাদের এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। এই হত্যাকান্ডটিই ছিল ট্রুজিলোর পতনের মূল কারণ। তাঁদের এই আত্মত্যাগের স্মরণে জাতিসংঘ ২৫ নভেম্বরকেআন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন নির্মূল দিবসহিসেবে ঘোষণা করেছে। 

 বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তিনজন অকুতোভয় নারীর জীবনচিত্র যখন এই পর্বে তুলে ধরছি, তখন আমার মননে দাগ কাটছিল এক চিরচেনা মুখচট্টগ্রামের বিপ্লবের অগ্নিশিখা প্রীতিলতা। যদিও বাংলাদেশের ব্যাংকনোটে তাঁর প্রতিচ্ছবি ঠাঁই পায়নি, কিন্তু বিদেশের এই মুদ্রাগুলোর ভাঁজে ভাঁজে আমি প্রীতিলতারই অদম্য সাহসের স্পন্দন খুঁজে পাই। কলাম্বিয়ার পোলিকার্পা যেমন ২২ বছর বয়সে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, প্রীতিলতাও ঠিক ২১ বছর বয়সে একই তেজ দেখিয়েছিলেন। জামাইকার ন্যানি যেমন পাহাড়ে গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, প্রীতিলতাও চট্টগ্রামের পাহাড়ে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। যে ক্লাবের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল— 'উড়মং ধহফ ওহফরধহং ধৎব হড়ঃ ধষষড়বিফ', সেখানে মাস্টারদা সূর্যসেনের নির্দেশে নেতৃত্ব দিয়ে প্রীতিলতা প্রমাণ করেছিলেন যে দেশপ্রেমের লড়াইয়ে নারীপুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। ব্রিটিশদের হাতে ধরা না দিয়ে সায়ানাইড পান করে তাঁর সেই আত্মত্যাগ ছিল মুদ্রার ওপর ফুটে থাকা ওই বিশ্ববরেণ্য নারীদের মতোই এক মহিমান্বিত বিসর্জন। 

জামাইকার ন্যানি শোষণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার প্রতীক, কলাম্বিয়ার পোলিকার্পা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, আর ডোমিনিকান রিপাবলিকের মিরবাল বোনেরা সারা বিশ্বের নারীদের সুরক্ষার অনুপ্রেরণা। আর এই সবার সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের প্রীতিলতা। ভৌগোলিকভাবে দেশগুলো ভিন্ন হলেও এই মহীয়সী নারীদের রক্তের বর্ণ এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল অভিন্ন। ব্যাংকনোটের এই ক্যানভাসগুলো আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñপৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই হোক, বীরত্ব ত্যাগের কোনো সীমানা নেই। 


 

Related Posts