এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা.. আনিস আহমেদ
কে এই অরিন্দম? ইনি হচ্ছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। সেই মাহফুজ আলম যার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে তদানীন্তন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস তাঁকে ২৪—এর আন্দোলনের মাস্টার মাইন্ড বলেছিলেন। বাংলাদেশের একাধিক পত্রিকায় তাঁর ফেসবুক পোস্টের প্রসঙ্গ তুলেই জানানো হয় যে তিনি আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের জন্য কিছু বিষয়কে সরাসরি দায়ী করেছেন। তিনি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে যেদিন ২৪—কে ৭১—এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থীদের উত্থানের জন্য অন্তরীণ সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেছে, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে। যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ।’ মাহফুজ আলম আরও লিখেছেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে মজলুমগণ চুপ ছিল।’ অরিন্দমের অর্থাৎ মাহফুজের এই আকস্মিক উপলব্ধি প্রমাণ করলো যে এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিগুলি। ২৪—কে ৭১এর বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর যে কথা বলেছেন মাহফুজ আলম, সে ঘটনাও তো ঘটিয়েছেন তাঁরই গুরু ইউনুস যিনি এক সাক্ষাৎকারে দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেছিলেন ইতিহাসের উপর রিসেট বাটন টিপে দেওয়ার কথা। এই বোতাম টিপে ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় ২৪কে ৭১এর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছে। মব সংস্কৃতির যে কথা মাহফুজ বলেছেন তাকে তো উৎসাহিত করেছে সেই অন্তর্বর্তী সরকার যাকে মাহফুজ বার বার অন্তরিণ সরকার বলেছেন তার এই পোস্টে। অন্তরিণ কি তার বানান ভুল, শব্দটি কি তিনি জানেন না; নাকি ইচ্ছাকৃতভাবেই অন্তর্বর্তী সরকারকে অন্তরিণ সরকার বলছেন যে সরকার সত্যিই কারও না কারও কাছে অন্তরিণ ছিল, সে কী দেশী কোন রাজনৈতিক দল নাকি বিদেশি কোন শক্তি!
তবে মাহফুজ আলমের পুরো পোস্টটা পড়লে মনে হবে তিনি জামায়াতে ইসলামির মতো উগ্রবাদী দলগুলোর প্রতি ক্ষিপ্ত। কারণ তাদের ষড়যন্ত্রেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিলীন করা হচ্ছে, মবদের উস্কে দেওয়া হচ্ছে। তিনি আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে আরও লিখেছেন ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন এদেশে কাওয়ালি/ইনকিলাবি কালচারের মতন রিগ্রেসিভ কালচার—ব্যবস্থা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোকাবেলার মহারম্ভ হয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন নির্বাচনী বাঁটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হলো এন্ড বিএনপি—জামাতের বার্গেইনিং টুল বানানো হলো’। কাওয়ালী এবং ইনকিলাব সংস্কৃতিকে তিনি ‘রিগ্রেসিভ—কালচার ব্যবস্থা অর্থাৎ পশ্চাৎমুখী সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা বলেছেন। বাঙালি সংস্কৃতির বিপরীতে এই পশ্চাৎমুখী সংস্কৃতি চর্চাকে উৎসাহিত করে মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে জলাঞ্জলি দেবার অপচেষ্টা চালিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার এবং তাদের অনুগামীরা। আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের কারণ হিসেবে যে সব বিষয়কে মাহফুজ আলম তুলে ধরেছেন, তার সবটাই সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক। তবে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে এমনটি বলার সময় এখনও আসেনি। সে জন্যেই সঙ্গত কারণে একটি প্রশ্ন উঠতেই পারে যে মাহফুজ কি পুরো বিষয়টিকে ব্যঙ্গ—রসাত্মক করে তুলছেন, নাকি সত্যিকারের গুরুত্ব সহকারে বলছেন? যদি ব্যঙ্গ রসাত্মকভাবে বলে থাকেন, তাহলে তাঁর জন্য সেটা ঠিকই আছে। তিনি যে তিমিরে ছিলেন, সেই তিমিরেই আছেন। কিন্তু বিষয়টিকে তিনি যদি গুরুতর বলে মনে করেন তাহলে বুঝতে হবে মাহফুজ আলমের চিন্তার পরিবর্তন এসেছে। তবে এই ধরনের কথা তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে (যাকে তিনি বার বার অন্তরিণ সরকার বলে উল্লেখ করেছেন) সতর্ক করে দেওয়ার জন্য আগে কেন বলেননি? ২৪এর আন্দোলনের ‘মাস্টার মাইন্ড’ বলে মুহাম্মদ ইউনুস যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন এবং মনে করা হয় হাসিনা—বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই মাহফুজ আলম এখন কি বুঝতে পারছেন যে সেই আন্দোলন কেবল শেখ হাসিনাকে অপসারণ করার আন্দোলন ছিল না, সেই আন্দোলন শেষ অবধি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—বিরোধী আন্দোলন ছিল? যাঁকে এই কথিত আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বলা হলো তিনি তো বুঝলেনই না এই আন্দোলনের পেছনে কারা তৎপর ছিল।
অতএব যে কথাটি বহুল আলোচিত যে এই কথিত আন্দোলনের পেছনে জামায়েত—শিবির এবং তাদের সহযোগীরা সক্রিয় ছিল সেটাই প্রমাণিত হলো। কোটা আন্দোলনের নামে, সাধারণ শিক্ষার্থীর বেশ ধারণ করে লুকিয়ে থাকা বাঙালি ও বাংলাদেশ বিরোধীরা পুরো আন্দোলনকে সরকার অপসারণের আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনে পরিণত করলো। সাধারণ জনগোষ্ঠীর এই তিক্ত সত্যটা বুঝতে সময় নিয়েছে অনেক। কিন্তু মাস্টার মাইন্ড কেন এটা বুঝতে পারেননি! নাকি বুঝেও ছাড় দিয়েছিলেন বাড়তি কিছু সুবিধা পাবেন বলে এবং এখন সেই সুবিধে পাননি বলে কিছুটা হলেও উচ্চ—কন্ঠ হয়েছেন? মাহফুজ আলমের এ পোস্ট নানান বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে যে সত্যি কথাটা বেরিয়ে এসেছে সেটি হলো আওয়ামী লীগের ফিরে আসা মুক্তিযুদ্ধের সব ধরনের আদর্শকে পুনঃস্থাপন করবে। সেটি হয়ত এখন মাহফুজ কল্পনা কিংবা অনুমান করছেন। কিন্তু এই অনুমানের পেছনে যে সত্যটা নিহিত আছে সেটি হলো, যেমনটি আমরা এখন বাস্তবে অনুভব করছি। যারা এক সময়ে এ রকম কথা বলতো যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে বেচে খাচ্ছে, তারাই এখন দেখছে যে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রায় নিঃশেষ করানোর চেষ্টা হচ্ছে। এই চেতনা শব্দটির ব্যাপারে কারও কারও অ্যালার্জি আছে। আর সেই রকম অ্যালার্জি রয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণের ক্ষেত্রেও। লক্ষ্য করার বিষয় মাহফুজ আলম নিজেও মুক্তিযুদ্ধের কথা এত বলা সত্ত্বেও, বঙ্গবন্ধুর নাম অবধি উচ্চারণ করেননি। সে জন্যেই মনে হয় তাঁর এই আক্ষেপ হয়ত কেবলই শ্লেষাত্মক।
তবে মাহফুজ আলমের গোটা পোস্টটাই রাজনৈতিক মহলে এক রকমের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু রকমের প্রতিক্রিয়ায়। মাহফুজ যে উদ্দেশেই এই পোস্টটা দিয়ে থাকুন না কেন, এতে মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতি জাগরণের কথা আছে, আছে মবের অপসংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাবার কথা। কাজেই আমাদের এই নব্য অরিন্দম বিষাদে না কি আনন্দে এতো কথা বললেন সেটি সামনের দিনে বিবেচ্য বিষয়।
