৩৫ বছর খুব কম সময় নয়
প্রকাশনার ৩৫ বছর পূর্ণ করে ৩৬ বছরে পদার্পণের প্রাক্কালে এক ধরনের হতাশা বা দুঃখবোধ উঁকি দিয়ে যাচ্ছেÑ তাহলে কি ছাপা কাগজের আয়ু ফুরিয়ে আসছে? নিউইয়র্ক টাইমস অবশ্য নতুন সহ¯্রাব্দের প্রথম সংখ্যাতেই অর্থাৎ ২০০১ সালের ১ জানুয়ারির সুবিশাল স্মারক সংখ্যার প্রথম পাতাতেই এইভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করছিল যে ২১০০ সালের প্রথম সংখ্যাটির চেহারা কেমন হবে? দেড়শ বছরের এই দাপুটে নিউইয়র্ক টাইমস দ্বিধাহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছে ২১০০ সালে আর কোনো ছাপা কাগজ থাকবে না। এই ভবিষ্যদ্বাণীর কারণ আছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ১৯৯২ সালে আগের বছরগুলোর ক্রমাগত সাকুর্লেশন পড়ে যাওয়ার কারণে আর্থার ওক সালজবার্গার তার পুত্রের হাতে প্রকাশনার দায়িত্ব অর্পণ করে পদত্যাগ করেন। সালজবার্গার জুনিয়র তখনকার নতুন প্রযুক্তি ইন্টারনেটে পত্রিকাকে জনপ্রিয় করার জন্য তার আইটি বিশেষজ্ঞ কাজিনদের নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং যাত্রা শুরু করে nytimes.com ওয়েবসাইটের। যে এ্যাড রেভিনিউ কমতে শুরু করেছিল ছাপা সংস্করণের, তা চূড়ান্ত গ্রিডলকে পড়ে ৯/১১ এর মত ভয়াবহ ঘটনায়। নিউইয়র্ক সিটির রিটেইল ব্যবসায় ধস নামলে তা প্রায় চূঢ়ান্ত বিপর্যয়ে পড়ে। প্রতিদিনের একাধিক পূর্ণ পাতার বিজ্ঞাপন বন্ধ বা অনিয়মিত হয়ে যায়। এইসব বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মেসি’স, স্যাকস ফিফথ এভেন্যু, লর্ড এন্ড টেইলর, ফেন্ডি, বার্গডফ গুডম্যান, টিফানি এন্ড কো., রোলেক্স ইত্যাদি। এ্যাড বন্ধ হয়ে যায় এয়ারলাইনগুলোরও।
কিন্তু অনলাইন সংস্করণ প্রথমে আমেরিকাজুড়ে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একদা নিউইয়র্ক টাইমস নিউইয়র্ক ও এর আশেপাশের স্টেট বা শহরগুলোতে সুলভমূল্যে সহজলভ্য ছিল। অনলাইনে তা সকলের চোখের নাগালে চলে আসে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিস্তৃতি লাভ করায়, নিউইয়র্ক টাইমস পৃথিবীর সর্বত্রই পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর জন্য বার্ষিক যে ফিস, তার থেকে নিউইয়র্ক টাইমস কোম্পানি বিপুল রেভিনিউ অর্জন করে। সেই সাথে প্রতিটি নিউজ ফিডে এবং নানাভাবে বিভিন্ন পণ্যের প্রসারে অনেক ব্যবসায়ী নিউইয়র্ক টাইমসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।
নিউইয়র্ক টাইমসের ছাপা সংস্করণের পাতা কমে এসেছে। সাকুর্লেশন কমে এসেছে। দাম বেড়েছে। আর ডিজিটাল ভার্সন যে কোনো ঘটনার পরপরই প্রধানত তাদের নিজস্ব সংবাদদাতার মাধ্যমে পাঠকদের কম্পু্যটারে, ল্যাপটপে, আইপ্যাডে বা ফোনে চলে যাচ্ছে। অতএব মানুষ আর কাগজে ছাপা সংস্করণে তেমন আগ্রহী নয়।
অপরদিকে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার গাছ উজাড় হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে। কারণ সর্বশেষ মার্কেট রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপি কেবল সংবাদপত্র ছাপার জন্য ১৮ মিলিয়ন থেকে ২৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন নিউজপ্রিন্ট খরচ হয় বছরে। তাছাড়া ডিজিটাল নিউজপোর্টালের জন্য ব্যয় ন্যূনতম। ছাপা কাগজের জন্য শুধু নিউজপ্রিন্ট নয়, মুদ্রণ ব্যয়, বিতরণ ব্যয়, (মুদ্রণের সাথে লেবার খরচসহ কালি ও মেশিনের ব্যয়, বিদ্যুতের ব্যয়) অনেক সংবাদপত্রকে বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য করেছে। যেমন ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই ৩,৫০০ সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে।
এ হচ্ছে আমেরিকার মূলধারার তো বটেই বিশ্ববিখ্যাত সংবাদপত্রের খতিয়ান। নিউইয়র্ক টাইমসের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভবিষ্যদ্বাণীর ২৫ বছরে আজ যারা ছাপা কাগজ প্রকাশ করেন তারা বুঝতে পারছেন এইসব কাগজের দিন ফুরিয়ে আসার নির্মমতা। এমন কি নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কম্যুনিটিতেও এর আঁচ লাগা শুরু হয়েছে। কিন্তু আশার কথা অনেক বাংলাদেশী ডিজিটাল পত্রিকা পড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। আর বয়সী বিশেষ করে ষাটোর্ধ ইমিগ্রান্টরা এখনো ছাপা কাগজ হাতে নিয়ে পড়তে ভালোবাসেন। যেসব কাগজ এখনো ছাপা হয়, সে সব কাগজের পাঠক প্রধানত বয়স্ক ইমিগ্রান্টরাই।
কিন্তু সমস্যা শুধু ছাপা বা ডিজিটাল কাগজে নয়, সমস্যা ডিজিটাল প্রযুক্তির সুযোগ গ্রহণ করে অনেকেই অপতথ্য, কুতথ্য, ভুল তথ্য, অতি তথ্য, প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে চরিত্র হননের মতো খবর দিচ্ছে। ফলে কিছু মানুষ একে মুখরোচক মনে করে বিনোদন সামগ্রী হিসাবে সাময়িকভাবে গ্রহণ করলেও দ্রুতই তাদের চেহারা উন্মোচন হয়ে যায়। সাংবাদিকতার তিনটি মূল স্তম্ভ হলো Truth, Accuracy এবং Accountability. এই তিনটি জিনিস না থাকলে সাংবাদিকতা লাইনচ্যুত হয়। একবার লাইনচ্যুত হলে তাকে প্রতিস্থাপন করা কঠিন।
সাপ্তাহিক বাঙালী ১৯৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত গিমিক বা চমক পরিহার করেছে, তথ্য যাচাই না করে ঝুঁকিপূর্ণ খবর প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছে। কখনোই শীর্ষে ওঠার বা লাইমলাইটে থাকার জন্য অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়নি। বিজ্ঞাপনের জন্য নিজের আদর্শ থেকে সরে যায়নি। সাপ্তাহিক বাঙালী তার নামের সাথে সংগতিপূর্ণ নিজের আত্মপরিচয়কে এই প্রবাসে সবার আগে স্থান দিয়েছে। নিজ দেশের মুক্তিযুদ্ধকে, একাত্তরকে, মুক্তিযোদ্ধাদের, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবিচল থেকেছে অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও।
সাপ্তাহিক বাঙালী দেশের বাইরে যেসব বাঙালি প্রতিভা বিকশিত হচ্ছে মূলধারার প্রতিভার সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে, তাদের খুঁজে বের করে তুলে ধরছে, নতুন প্রজন্মের অগ্রগতিকে শনাক্ত করছে, তাদের বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাতেও উদ্বুদ্ধ করছে। সর্বোপরি দেশের বাইরে বাংলা ভাষার লেখকদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছে একটি সুস্থধারার প্লাটফর্ম হিসাবে।
ছাপা কাগজের জন্য নিশ্চয় আগামী দিনগুলো খুব আশাবাদের নয়। হয়ত আরো কিছু বছর ছাপা এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাংলা সংবাদপত্রসমূহ পাশাপাশি প্রকাশিত হবে। তারপর ক্রমশ ডিজিটালে রূপান্তর হবে। কিন্তু ‘সকলেই সাংবাদিকতা বোঝে’র মত মানুষদের কিভাবে, কোন্ পদ্ধতিতে ‘সত্য খবর প্রকৃতপক্ষেই সত্য খবর’ বোঝানো সম্ভব হবে তা বলা অত্যন্ত কঠিন। কারণ বাংলাদেশে একাত্তরকে, বঙ্গবন্ধুকে নিজ নিজ পদ্ধতিতে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পার্সপেকটিভে মুছে ফেলার বা অস্বীকার করার বিষয়টি বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গ্রুপ চালিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়, যেভাবে ভাল ও মন্দের পার্থক্য নিরূপণে ব্যর্থতা লক্ষণীয় হচ্ছে এবং অপরকে অকারণে অসম্মান ও ছোট করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে, তাতে ভীতির ও আশংকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আশার কথা হলো, এই প্রবণতা সেই অর্থে দেশের বাইরে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশী বংশোদ্ভুতদের মধ্যে একেবারেই নেই। এই আমাদের আশা।
বিরূপ পরিস্থিতি আসে। ইংরেজিতে বলে ‘ডার্ক এজ’। এই অন্ধকার সময় রাতের মতোই। একসময় ভোর হয়। নতুন ডিজিটাল পদ্ধতি নিশ্চয় মানুষদের যতটুকু অপব্যবহারের দিকে ধাবিত করছে, তা ক্রমশ কমে গিয়ে আলোর দিকেই যাবে।
গত ৩৫ বছর যারা সাপ্তাহিক বাঙালী পড়ছেন, অবিরল ভালোবাসছেন, সমর্থন করছেন, এতে লিখছেন, বিজ্ঞাপন দিচ্ছেনÑ তারাই আমাদের সাহস, আমাদের ৩৫ বছরের সাহস। ৩৫ বছর কিন্তু খুব কম সময় নয়।
