আট প্রহরের নজরুল: আমার ‘পিয়া পিয়া পাপিয়া’ || নিরুপমা রহমান
জীবন বয়ে চলে সময়ের তালে। আমরা সাধারণ ছাপোষা মানুষ আটপৌরে জীবনকে নিস্তরঙ্গ ভাবি, ভেবে স্বস্তি পাই। কিন্তু সত্যিই কী সকালে ঘুম ভাঙা থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া ইস্তক দিনমান জীবনের বহমানতায় কোথাও তরঙ্গ নেই, নেই বিচিত্রতা, নেই বর্ণিল পরিক্রমা? না কী সেই তরঙ্গময় বহমানতা আমরা দেখেও দেখিনা, দেখতে চাইনা বা অনুভবে নেই না, নিতে জানিনা?! আর তাই যখন তেমন ফুরসৎ মেলে কিংবা সুযোগ ঘটে, ভোরের সূর্যোদয় আর গোধূলির সূর্যাস্তের রঙে, আভায়, আর পারিপার্শ্বিকতায় হৃদয়ে আনে ভিন্ন ব্যঞ্জনা। তপ্ত দুপুরের অলসতা আর গভীর রাতের ক্লান্তি মনে জানান দেয় ভিন্ন ব্যঞ্জনায়। আর পূর্ব থেকে পশ্চিমে দিবাকরের পরিক্রমায় আর সুধাকরের রূপালী জোছনায় কিংবা নিকষ অমাবস্যায় আমাদের শরীর আর মনের এই যে নানান স্থিতি, চেতনে আর অবচেতনে, তাই যেন মনে করিয়ে দেয় বারবার যে এই জীবন মোটেও নিস্তরঙ্গ নয়। সাধারণ সাদামাটা আটপৌরে জীবনের প্রতিদিনের প্রতি প্রহর জীবনের গল্পে নিয়ে আসে নানান রস, নানান ভাবনা, নানান ব্যঞ্জনা। আর সেই গল্পকে বোধে আর মননে আর মানসে নিতে পারলে তবেই না যাপিত জীবনের প্রতিদিন হয়ে ওঠে এক নিরন্তর উদযাপন।
জীবনের মধ্যভাগে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালে মর্মে গভীর অনুভব জাগে যে আমার যাপিত জীবনকে ‘সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে’ নিত্যকার উদযাপন করে তুলেছে ‘এক হাতে মোর বাঁশের বাঁশরী’ধারী নজরুল। দিনের আট প্রহরকে চিনে, জেনে, বুঝে আটপৌরে জীবনকে রঙ, রস আর সৃজন আনন্দে সাজাতে শিখেছি নজরুলের গানের বাণীতে মূর্ত হয়ে ওঠা রাগের সুরে, ভাবে, চলনে। নজরুল তাই আমার কাছে দ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, আধুনিক—অসাম্প্রদায়িক— সাম্যের কবি বা অন্য নানান গালভরা তকমা ছাপিয়ে আট প্রহরের চিরচেনা ‘বুলবুল’, আমার গানের কবি। নজরুলের গানের ভেতর দিয়ে সুর আমার কাছে কেবলমাত্র যে অর্থবহ হয়ে ওঠে, তাই নয়; তাঁর গানের বাণীই আমাকে শেখায় ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন’ আসলে সুর আর সতত ‘খুঁজি তারে আমি আপনায়’ হলেই নিত্যকার জীবনে নিয়ত ‘আবার ভালোবাসার সাধ জাগে’। জীবন যখন অমন নিজেকে খোঁজার নিরন্তর যাত্রা হয়ে ওঠে যেখানে ভালোবাসার জোরে ’পুরাতন প্রেম’ চোখে ‘নতুন লাগে’; তখন জীবন আর ‘নিস্তরঙ্গ’ থাকে কি? আমার নজরুল তাই আমার আট প্রহরের সুরের সাথী, আমার ‘চিরবন্ধু, চিরনির্ভর’ সুরের বিহঙ্গ।
সেই শৈশবে স্কুলে যাবারও আগে বাবা মায়ের উৎসাহে আর উদ্যোগে সুরের ভেলায় উঠে বসবার সুযোগ ঘটেছিলো। সেই ভেলায় চলতে চলতে ধীরে ধীরে জানা হলো কঠিন রসকষহীন ব্যাকরণের গন্ডি ছাপিয়ে প্রতিটি রাগ তার নিজস্ব অনন্যতায় সবিশেষ। স্বর আর সুরের ভিন্নতর মেলবন্ধনে নানান রাগের মধ্য দিয়ে মনের নানান আবেগ আর অনুভূতি প্রকাশের ধরন যায় বদলে। ‘রঞ্জয়দি ইতি রাগ’। স্বরের বিন্যাসে গাঁথা সুরের লহরী মনকে রঞ্জিত করে বলে এর নাম ‘রাগ’, যা এসেছে রঞ্জক শব্দ থেকে। ভারতীয় সঙ্গীততাত্ত্বিক পন্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখন্ডে রাগসময়ের যে বিন্যাসের কথা বলেন, তার মূলেও আছে এই বিশ্বাস যে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মনোজগতেরও রূপান্তর ঘটে, আর সেই রূপান্তরেরই সুরময় ভাষা, স্বরের প্রকাশ নানান রাগ।
যেমনটা বলছিলাম, সাঙ্গীতিক ব্যাকরণের গন্ডি ছাপিয়ে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতিটি রাগের নিজস্ব চরিত্র আছে, রস—রূপ—ভাব আছে। ঠিক যেমন বাগানের নানান ফুল তাদের নিজস্ব অনন্য রূপে, রঙে, আর গন্ধে সকলের মন মাতায়। বাগানের কিছু ফুল যেমন দিনের আলোতে দ্যুতি ছড়ায়, সূর্যের মুখপানে চেয়ে বাগানকে বর্ণিল করে, কিছু ফুল রাতের অন্ধকারে তাদের সুবাস দিয়ে জানান দেয়, ভিন্ন ভিন্ন রাগও তেমনি দিনের নানান সময়ের আবেশ আর অনুভূতিকে প্রকাশ করে নিজস্ব অনন্যতায়। এখানে কেবল সুরের নিয়ম নয়, বরং স্বরের বৌদ্ধিক আর সৃজনশীল মেলবন্ধনে সৃষ্ট সুরেলা অনুরণনের যে ভাবপূর্ণ ব্যাপ্তি সেটাই মনকে রাঙায়, চিত্তে দোলা দেয়।
চব্বিশ ঘণ্টার দিনের ব্যপ্তিতে সময়কে প্রকৃষ্টরূপে হরণ করে, ধারণ করে আটটি প্রহরে ভাগ করে নেয়া হয়। প্রতি তিন ঘণ্টায় এক প্রহর হিসাব করে দিনে চার প্রহর এবং রাতে চার প্রহর করে মোট আট প্রহরে পুরো দিনকে হিসেব করা হয় সেই প্রাচীনকাল থেকে। নিত্যকার এই অষ্টপ্রহরে নানান রসের ধারার মিলন হয়, নানান অভিজ্ঞতায় হৃদয় স্নাত হয়, নানান স্বপ্নে মন উদ্বেল হয়। দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আমাদের মনের স্থিতি, ভাবনার প্রয়াস আর কর্মের স্পৃহা যেমন করে বদলে যায়, ঠিক তেমনি করেই আবেগ আর অনুভূতি প্রকাশের প্রতিরূপও বদলায় নিজস্ব অনন্যমাত্রিকতায়।
দিনের আটপ্রহরের সুরে আর স্বরের মেলবন্ধনে তাই হাসি—আনন্দ, বিরহ—বিচ্ছেদ, বিহবলতা—ক্লান্তি—আশাহীনতা কিংবা উচ্ছ্বলতার রঙ এসে মেলে; প্রেম—প্রেমহীনতা, প্রণয় রাগ, অভিমান, অভিসার সবেতেই রঞ্জিত হয়। আটপৌরে জীবনের নানান রসের ধারার খোঁজ যেমন মেলে আটপ্রহরের সুরে, ঠিক তেমনি সুরের নান্দনিকতার মাধ্যমে নবরস (শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রুদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত ও শান্ত) মনের বিশেষ বিশেষ অবস্থা, আবেগ, অনুভূতি প্রকাশ করে। দিনের বিভিন্ন প্রহরে সহজাতভাবেই আমাদের মনের ভিন্ন ভিন্ন আবেগ, প্রত্যাশা, বিষাদ, উল্লাস কিংবা ধ্যানের প্রকাশ ঘটে। তাই ভোরের রাগ আর গভীর রাতের রাগের চলন বলন ভাব ভাষা এক নয়; এক নয় গোধূলির রাগে প্রকাশমান দীর্ঘশ্বাস আর মধ্যাহ্নের রাগের চপল চাঞ্চল্য।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে আশৈশব পরিচয় ব্যাকরণ মাফিক অষ্টপ্রহরের রাগের সাথে পরিচয় করিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক রসকষহীন ব্যাকরণের গন্ডি ছাপিয়ে সেই পরিচয় প্রণয়ে রূপ নিয়েছে তখনই, যখন ধীরে ধীরে বাংলা গানের বাণীর মাঝে হিন্দুস্থানী রাগের স্বর আর সুরের প্রকাশভঙ্গিকে, তাঁর চলন বলনের ব্যাঞ্জনাকে খুঁজে পেয়েছি, বুঝে নিতে শিখেছি নিজের মতো করে। সুরের ভেলায় সেই তিন বছর বয়সে যেই যাত্রা শুরু করেছিলাম সেখানে যত বয়স বেড়েছে, ততোই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রাগের স্বর সঙ্গতির সঙ্গে এর রস আর ভাবের বোধের মিলন প্রয়াসে, এর প্রেমে মজে নিজের মতো প্রকাশ করবার আমাটাঅনন্ত যাত্রার উৎসমুখে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন নজরুল। তাঁর গানে অভূতপূর্ব বাণীর সাথে সুরের যে মিশেল, আর তার যে চিত্রিত রূপকল্প তা আমার হৃদয়ের গহীনে খুব সহজেই বিভিন্ন রাগের রূপ এঁকে যায়, রসে জারিয়ে দিয়ে যায়। আবার জীবনের বিভিন্ন বাঁকে তাঁর একই গানের বাণীই ভিন্নমাত্রিকতা নিয়ে আমার কাছে ধরা দিয়েছে আর একই রাগও মনকে রাঙিয়েছে, হৃদয়কে মথিত করেছে, আর্দ্র করেছে নানান ভাবে, নানান রসে।
জীবনভর তাই নানান সময়ের বাঁকে, ঘটনার চক্রে আমার কাছে আট প্রহরের রাগের স্বর—সুরের সঙ্গতির সঙ্গে নজরুলের গীতিকবিতার চিত্রকল্প একাকার হয়ে গিয়েছে। সেখানে ভোরের আকাশের প্রথম জাগরণ থেকে শুরু করে সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা কিংবা প্রাণস্পর্শী প্রত্যাশার আনন্দ সঙ্গে নিয়ে দিনের কর্মচঞ্চলতায় গভীর দর্শনের আস্বাদন মূর্ত হয়েছে আমার মানসে একান্ত আমার জন্য, আমার মতো করে। এতে কখনও মিলেছে দিনান্তের ক্লান্তিনিঃশ্বাস, আবার কখনও খুঁজে পেয়েছি গোধূলির বিধুরতা কিংবা উন্মুখ প্রতীক্ষার যাতনা। এই পরিক্রমায় আমার কাছে সন্ধ্যা কখনও প্রশান্ত, কখনও উচ্ছ্বল বা উত্তাল, কখনও অশ্রুসিক্ত অভিমানিনী বা অভিসারিকার হাত ধরে নিশীথের ঘনান্ধকারে যাত্রা করে অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতায় গিয়ে মিশেছে।
প্রভাত, দিনের প্রথম প্রহর। এই সময়ের রাগ আহির ভৈরব। স্কুলপড়ুয়া আমার যখন প্রথম এই রাগের সাথে পরিচয় হলো, তখন ভৈরব ঠাটের এই রাগের শুদ্ধ গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম আর ধৈবত এর সাথে কোমল ঋষভ আর নিষাদের বিশুদ্ধতা বজায় রাখা কিংবা এর সহজাত চলনে কোমল নিষাদ, শুদ্ধ ধৈবত, কোমল নিষাদ, কোমল ঋষভ, ষড়জের স্বরসঙ্গতি আয়ত্তে আনতে, কিংবা রাগের ব্যাকরণগত শুদ্ধতা বজায় রাখতেই ছিল সকল মনোযোগ আর কণ্ঠশীলন। ওই একই সময়ে নজরুলের আহির ভৈরবে বাঁধা ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি’ গানটি যেন আমাকে একেবারে নতুন করে এই রাগের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। এই গানের বাণীর ভেতর দিয়ে আজীবনের মতো আহির ভৈরব আর ঊষালগ্নে সূর্যোদয়, রাগের চলন আর ভোরের প্রকৃতি যেন একাকার হয়ে মিশে গেল আমার কাছে। জ্যোতির্ময় ধ্যানমগ্ন যোগী ভিখারির রূপকল্পে সেই যে আমার আহির ভৈরব রাগের শান্ত প্রকৃতি আর ভক্তি রসের অনুসন্ধান শুরু হলো, তা অদ্যাবধি থামেনি কখনও। জীবনের একেক বয়সে, একেক মুহূর্তে ‘যোগী ভিখারি’র প্রতি একেক রকম করে যেন বারবার নতুন করে সমর্পিত হই। একসময় গাইবার সময় ‘রাসবিলাসিনী’ আমি যেন আহির ভৈরবের শুদ্ধ স্বরে অরুণকান্তি যোগীর ‘প্রখর তেজ’ আর ‘জ্যোতিঃপুঞ্জ’কে পেয়ে বিনম্র মুগ্ধতায় থাকতাম। যতো বয়স বাড়লো, মন পরিণত হলো, ততোই যেন ‘ব্রজবালা’ হয়ে, ঋষভ আর নিষাদের কোমলতায় প্রবল প্রতাপ যোগীকে এই শ্রীমতির জন্য ‘বিষাণ ফেলিয়া হও বাঁশরি—ধারী’ হবার আকুতি জানাবার সুর হয়ে উঠলো আমার আহির ভৈরব। বাদী মধ্যম আর সমবাদী ষড়জের স্বরবিন্যাসে পূর্বাঙ্গে ভৈরব আর উত্তরাঙ্গে কাফির মেলবন্ধনে সূর্যের প্রখর তেজকে ‘নব মেঘ—চন্দনে ঢাকি’ কেমন করে ‘প্রিয় হয়ে দেখা দাও’ বলে প্রেমময় আর্তি জানানো যায়, তাও যেন নজরুলের বাণীর রূপকল্পই আমাকে জানিয়ে যায় জীবনভর।
নজরুলের বাণীতে আহির ভৈরবের সুরে আমার কাছে শ্রীরাধা আর পার্বতী একাকার হয়ে যান, ব্রজের কৃষ্ণ আর কৈলাসের শিবও কোথাও গিয়ে সেই একই পুরুষ। অমন বোধ আমাকে বারবার করে দিনের শুরুতেই মনে করিয়ে দেয় যে এই জগৎজোড়া আপাত বহুত্বের মধ্যে আসলে একই সত্য বিরাজমান। এই বিভেদ আর দ্বন্দ্বের কালে বিবিধতার মাঝে ‘একং সদ্বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি’ সেই এক আর অদ্বিতীয়ের সন্ধান করার ভাবনা আর মানস, সত্য—সুন্দরকে জীবনে বিশ্বাস করে ধারণ করবার ইচ্ছে আর প্রয়াসের শক্তি আমি নিয়ত পাই নজরুলের কাছে, আহির ভৈরবের সুরে।
প্রভাতের পর দিনের দ্বিতীয় প্রহর পূর্বাহ্ন। করুণ, শান্ত ও ভক্তি রসের এক অনন্য সমন্বয় রাগ ভৈরবী পূর্বাহ্নের রাগ। কোমল ঋষভ, গান্ধার, ধৈবত ও নিষাদ এই রাগের চলনে স্নিগ্ধ, সংযত, প্রেমময় এক শৃঙ্গার রসের সৃষ্টি করে। একেবারে ছোটবেলায় ভৈরবী ঠাটের আশ্রয়ে বাঁধা যে ভৈরবী রাগ আমি শিখেছিলাম, তাতে নিয়ম মানা শুদ্ধতা ছিলো বটে, কিন্তু এর প্রাণভোমরার খোঁজ, এর রং—রস—রূপের সাথে পরিচয় হয়েছে ধীরে ধীরে। আর সেই পরিচয় রাগে আর অনুরাগে যে গভীর প্রেমে পরিণতি পেয়েছে, তার জন্য ভৈরবীতে বাঁধা নজরুলের গানের উল্লেখ না করলেই নয়। প্রতিটি সকাল যেমন নতুন করে অপার অফুরান সম্ভাবনা নিয়ে আসে, ভৈরবী রাগের মাঝেও লুকিয়ে আছে অসীম অন্তহীন ব্যাপ্তি আর ব্যঞ্জনা। আর তাই এই রাগে বাঁধা ঠুমরি, টপ্পা, ভজন, গজলে কড়ি, কোমল, শুদ্ধ বারোটি স্বরেই বিচরণ চলে রাগের অনন্য কিন্তু বহুমুখী শৃঙ্গাররস প্রকাশে। অফুরন্ত রসের অমন পরিব্যাপ্তি আছে বলেই ভৈরবীকে ‘রাগের রাণী’ বলেন অনেক সঙ্গীতজ্ঞ। আমার কাছে ভৈরবী যেন সতিকার অর্থেই আমার নারীজন্মের সুরময় প্রতিমূর্তি।
কেবলমাত্র নারীই জানে কেমন করে গভীর বিরহে ‘আমার নয়ন ভরে’ কেমন করে ‘শিশির ঝরে’; কেমন করেই বা ‘না মিটিতে সাধ মোর নিশি পোহায়’ যখন, তখন দিনের সূর্যের আলোতেও ‘গভীর আঁধার ছেয়ে আজও হিয়ায়’; আর ঠিক কীভাবে ‘নিভায়ে আমারো বাতি, পোহালো সবার রাতি’ হয় বা হতে পারে!! আর আমার মেয়ে থেকে নারী হয়ে ওঠায় ভৈরবীর অনুষঙ্গে নজরুল ছিলেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে। রাগ ভৈরবীর আবহে যে এক গভীর নিঃসঙ্গ বিষণ্ণতা ধরা পড়ে, তার সুরেও বাণী জোগান আমার নজরুল। ‘আঁচলের ফুলগুলি করুণ নয়ানে, নিরাশায় চেয়ে আছে মোর মুখপানে, বাজিয়াছে বুকে যেন কার অবহেলা’ — আমার বিরহে, আমার একাকীত্বে, আমার সঙ্গহীন বিষণ্ণ প্রহরে আমার ভৈরবী কোমল সুরে কথা ফোটায়। তাই জীবনের সমস্ত কঠিন সময়ে যখন ‘নিশি ভোর হলো জাগিয়া’র পরেও ‘পিউ কাহা পাপিয়ার’ কান্নায় ‘দুখনিশি’ ফুরায়না, তখনও আমার ভৈরবী আর ভৈরবীতে গান হয়ে আমার ‘জাগার সাথী’ নজরুল আমার ‘শিয়রে বাতি’ জ্বালান অনন্ত রসধারায়।
পূর্বাহ্ন পেরিয়ে সূর্য যখন পৌঁছায় মধ্যগগনে, তখনই আসে মধ্যাহ্ন। ভৈরবীর কোমল ঋষভকে পন্ডিত ভাতখন্ডের নিয়ম মেনে শুদ্ধ ঋষভ করে নিয়ে গান্ধার আর নিষাদ আরোহে বর্জন করলেই পেয়ে যাই আশাবরী। আর সেই আশাবরী ঠাটকে আশ্রয় করে কেবল আরোহে গান্ধার বাদ দিয়ে তৈরি হয় ষাড়ব—সম্পূর্ণ রাগ জৌনপুরী। কোমল গান্ধার, ধৈবত আর নিষাদ সঙ্গ দেয় বাকি চার শুদ্ধ স্বরকে। সমবাদী গান্ধার আর বাদী ধৈবতের আন্দোলনের সুরমূর্ছনায় গভীর আবেগ, বিরহ, আকুলতা ও ভক্তিভাবের অনুরণন ধ্বনিত হয়। বিশেষত ভক্তি ও শৃঙ্গার রসের অপূর্ব মেলবন্ধন এই রাগকে অনন্য করে তুলেছে। গুরুর কাছে খুব ছোটবেলায় যখন এই রাগের তালিম পাচ্ছিলাম, তখন ভক্তি রস বা শৃঙ্গার রস কোনোটা বুঝবার বা জানবার মতো বোধ বা মনন জন্মায়নি।
কিন্তু এই রাগে বাঁধা নজরুলের ‘মম মধুর মিনতি শোন ঘনশ্যাম গিরিধারী’ গানটির সাথে পরিচয় হয়েছিলো তারও আগে। সেই বয়সেও এই গানের ‘চরণ জড়ায়ে ধরে কাঁদিতে পারি’ পঙক্তির মাঝে যে আকুলতা, যে শর্তহীন নিবেদন আছে, তা বুঝতাম। আর এই অতোটুকু বোধই আমাকে কী অদ্ভুত ভাবে রাগ জৌনপুরীকে নিজের করে পেতে সাহায্য করেছে গভীরভাবে। উত্তরাঙ্গপ্রধান এই রাগে মনোমুগ্ধকর মধ্য ও তার সপ্তকে বিস্তার বিশেষভাবে এই আকুলতাকে অনন্যমাত্রিক করে তোলে। ধীরে ধীরে বয়সের সাথে বোধ আর মন দুইই যখন পরিণত হচ্ছে, তখন আবার নতুন করে জানলাম, বুঝলাম যে এই ‘চরণ জড়ায়ে ধরে কাঁদিতে পারি’ কেবলমাত্র মুহূর্তের বিচ্ছিন্ন ইচ্ছে নয়, এ এক প্রবল আকুতি, আকুল মিনতি। কেবল চিরসখা ঘনশ্যামের মুরলীধ্বনি শুনেই প্রেমের তৃষা মেটে না, তাই ‘নূপুর হয়ে যেন’ ওই ‘চরণ জড়ায়ে ধরে’ কাঁদবার ইচ্ছেতে যে এক অসীম ভক্তি আর প্রেম একাকার হয়ে মিশে আছে। আর এই বোধ আর ভাবনা যতো দিন যাচ্ছে, ততো গভীরভাবে জড়িয়ে আর জারিয়ে থাকছে মানস আর মনন; রাগ জৌনপুরীর চলনে বলনে আমার ভক্তি আর প্রেমকে আরও নিবিড় করে, প্রাণস্পর্শী করে খুঁজে পাচ্ছি নজরুলের গানে, তাঁর মর্মস্পর্শী শব্দবন্ধে, চিত্রকল্পে।
মধ্যাহ্ন পেরিয়ে বেলা গড়ায় অপরাহ্নে, যা কীনা দিনের চতুর্থ প্রহর। জৌনপুরীর প্রেমময় ভক্তিময় শৃঙ্গাররস বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভীমপলশ্রীর সুরময়তায় গভীর অন্তর্দর্শন আর প্রেমময় আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটায়। এই রাগে মিলনের সুর বাজে, ধ্বনিত হয় বিরহের মূর্ছনাও। সকল শুদ্ধ স্বরের সাথে কোমল গান্ধার আর কোমল নিষাদের সহাবস্থানে এক ধরনের মায়াবী, স্বপ্নময়, কিন্তু গম্ভীর বিষাদময় আবেশ তৈরি হয়। আরোহে ঋষভ ও ধৈবত বর্জনে ঔড়ব — সম্পূর্ণ এই রাগ যেন ঠিক বলে যায় দিনশেষে সব পাওয়া হয়না, সব পাওয়া যায়না, কিছু বাকী থেকেই যায়। আর এই বাকী থাকা, বাদ পড়া মানেই কিন্তু সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়া, মুছে যাওয়া নয়। ঠিক যেমন ভীমপলশ্রীর আরোহণে বাদ পড়া ধৈবত, অবরোহে সাধারণত পঞ্চমের সঙ্গে যুক্ত থাকে কান—স্বর হিসেবে, অর্থাৎ ধ প চলনে এক ধরনের মায়াময় টান আর সুরময় প্রবাহ সৃষ্টি হয়। একইভাবে আরোহণে বর্জিত ঋষভকে অবরোহণে মীড়ের মাধ্যমে ষড়জের সঙ্গে সংযুক্ত করে এই রাগের চলনকে আরও সংবেদনশীল করা হয়।
এই রাগে বিরহ আছে কিন্তু তাতে অতীতের মায়া আর আগামীর স্বপ্নময়তা দুইই মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে কোমল গান্ধার বাদী স্বর মধ্যমের মধ্যে মীড়ের টানে। তাই এই রাগকে বলা যায় মধুময় বিরহের রাগ, যেখানে আনন্দ ও বেদনা পাশাপাশি অঙ্গাঙ্গিভাবে সহাবস্থান করে। ‘বুকের মাঝে’ যখন হারানো দিনের মতো ‘আজো মধুর বাঁশরি বাজে’, তখন এতে যেমন বলা হয়ে যায় আজ কী আকুলতায় ‘মন কাঁদে তাই স্মৃতির তীরে’, ঠিক তেমন করে এটাও প্রকাশ পায় কী অপূর্ব প্রেমময়তায় একদিন ‘সহসা কখন, জলে ভরা দু’টি ডাগর নয়ন’ এসে মিশেছিলো এই নয়নে। সেদিনের ‘ফেলে ছুটে যাওয়া লাজে’ মুহূর্ত আজও শিহরণ জাগায় মনে। নিত্যকার জীবনের পড়ন্ত বেলায় প্রতিদিনের না পাওয়াটুকু আমার কাছে ঠিক যেন ভীমপলশ্রীর সুর, যেখানে বাদটুকু আবার পরের দিন বা তার পরের দিন বা অন্য কোন দিনে মায়াময় সুরেলা মীড় হয়ে ফিরবে। আমার নজরুল তো সেই আশার কথা শুনিয়েছেন অপরাহ্নের এই রাগের সুরে। ‘হারানো দিন বুঝি আসিবে না ফিরে’ ভেবে দীর্ঘশ্বাস আসে কিন্তু ভীমপলশ্রীর সুর জানান দেয় বারবার বারম্বার ‘তবু মাঝে মাঝে আশা জাগে কেন, আমি ভুলিয়াছি ভোলেনি সে যেন, গোমতীর তীরে পাতার কুটির, সে আজো পথ চাহে সাঁঝে’।
দিনের আলো ও রাতের অন্ধকারের মধ্যে এটি একটি চমৎকার সন্ধিক্ষণ গোধূলি। আর ঠিক এই সময়ের রাগ পূরবী। দিনরাতের সন্ধিক্ষণে এর সুরময় প্রকাশ ঘটে বলে এই রাগ একটি সন্ধিপ্রকাশ রাগ। কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবতের সাথে সাথে শুদ্ধ আর তীব্র মধ্যমের সহাবস্থান এই রাগের চলনে এক গুঢ় রহস্যাবৃত মরমি সুরেলা আবেশ যোগ করে। এই রাগে বিদায়ের বেদনা যেমন আছে, ঠিক তেমনি আছে ধীর, গভীর এক অন্তর্মুখী আবহ। বাদী স্বর গান্ধারকে ন্যাস স্বর ধরে মীড় ও কোমল স্বরের সূক্ষ¥ ব্যবহারে ‘বিদায়ের বংশী বাজে, ভাঙা মোর প্রাণের মেলায়’ বলে পূরবী করুণ রসের রাগ। এই রাগের স্বরবিন্যাস দিনশেষের ‘ফুল ঝরার বেলা’র মতো রাগের অন্তর্নিহিত করুণ সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। গুরুর কাছে ব্যাকরণ মাফিক শিখেছিলাম যে কোমল — কড়ি — শুদ্ধ স্বরের মেলবন্ধনে পাশাপাশি দুই মধ্যমের অবস্থানের ব্যঞ্জনায় এই রাগের পকড় স র গ ; ম গ ম গ ; ম ধ প ; ন ধ প ; গ ম প ; ম গ ম গ র স, ঠিক যেন একটি ধীরে নিভে যাওয়া দিনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে করুণ রস, ধ্যান এবং নীরবতার মিশ্রণে মানবমন তার অন্তর্গত গভীরতার মুখোমুখি হয়। সেই ব্যাকরণের শুদ্ধতায় আমার জন্য ভাষা যোগালেন, শব্দবন্ধে অমন এক ছবি আঁকলেন যা চিরতরে আমার কাছে গোধূলিবেলার মূর্তরূপ হয়ে রইলোÑ ‘গোধূলির মায়ায় ভুলে, এলে হায় সন্ধ্যা—কূলে, দীপহীন মোর দেউলে , এলে কোন্ আলোর খেলায়’।
সূর্য অস্তমিত হয় পশ্চিমে, অন্ধকার নামে, আসে সায়াহ্ন। রাত্রির প্রথম প্রহর। এই রাত্রি প্রথম প্রহরের নানান রাগ আমার ভারী প্রিয়, আমার অন্ধকার রাতের আলো। এর মধ্যে বেশির ভাগই কল্যাণ ঠাটের। কিন্তু সন্ধ্যাবেলার শান্ত, শ্রান্ত, নিবিড়, নীরব যে ছবিটা আমার মনে আঁকা আছে তার উৎসমুখেও দাঁড়িয়ে আছেন আমার গানের বুলবুলি নজরুল। শ্যামকল্যাণ রাগে বাঁধা এই গানখানি আমার কাছে সায়াহ্নের মূর্ত প্রতিচ্ছবি, পরম প্রতিমূর্তি । আমার নিত্যকার আটপৌরে জীবনে দিনশেষে ‘কল্যাণ—সুন্দর প্রশান্ত সন্ধ্যার’ যাপনে, ‘নিবিড় সমাধির গভীর আনন্দ’ উদযাপনে, উদার শান্তি দাও’ বলে ‘শ্রান্ত মনের ভার’ হরণ করবার আন্তরিক প্রার্থনায় রাগ শ্যাম কল্যাণ আর নজরুলের শব্দের চিত্রকল্প একেবারে অবিচ্ছেদ্য।
গুরুর কাছে জেনেছিলাম শ্যামকল্যাণ রাগে একদিকে গ ম প গ ম র স চলনে কামোদের কমনীয় রূপমাধুর্য আর অন্যদিকে দীর্ঘস্বর হিসেবে অবরোহণে স’ ন স’ ধ প স্বরবিন্যাসে ধৈবতের ব্যবহার কল্যাণ অঙ্গের গাম্ভীর্যকে আরও প্রসারিত করে। তাই খুব স্বভাবতই, এর চলনের যে অপূর্ব সৌন্দর্য, তা আসে এর স্বরবিন্যাসে, সুরের প্রকাশে কল্যাণ অঙ্গের উজ্জ্বলতা এবং কামোদ অঙ্গের মধুরতা একত্রে মিলিত হয়ে। ‘সেই মহাযোগে কর মোরে মগ্ন, যে মহাভাবে ভোর মৌন নীলাম্বর’ অভূতপূর্ব শব্দবন্ধে যেন ছবি এঁকে সেই মিলনকেই মনের গভীরে প্রোথিত করে দিয়েছেন আমার চিরনির্ভর, চিরসখা নজরুল। আমার প্রতিদিনের জীবনে রাত্রির প্রথম প্রহর তাই যেন শ্যামকল্যাণে বাঁধা সুরে ‘অন্তরে বাহিরে সেই অমৃত’ এর অবিরাম সন্ধান।
আমার প্রতি সায়াহ্নের এই অমৃতসন্ধানের মূল উপজীব্য হলো সুরের খোঁজ। আর সেই খোঁজ জুড়ে থাকেন আমার গুরু বিদুষী দীপালি নাগ, পন্ডিত বারীণ মজুমদার আর তাঁদের দেয়া আগ্রা ঘরানার সুরের ভেলার ছোট্ট বৈঠাখানি। তাই আমার নিত্যকার সন্ধ্যায় ‘গলে শেফালিকা, মালতী মালিকা দোলে’ শুদ্ধ আর তীব্র উভয় মধ্যম আর শুদ্ধ আর কোমল উভয় নিষাদকে নিয়ে সঙ্গী হয় নট বেহাগের সুর। গুরুর কাছে সদ্য কিশোরী আমি এই রাগে বাঁধা বন্দিশে পায়ের নুপুরের ‘ঝনঝন’ শব্দে ‘সাসÑ ননদিয়াÑ দেওরাÑ জেঠানিয়া’ এর নজর এড়াতে না পারলে কী বিপদেই না পড়তে হবে গাইতাম, কিন্তু সেই বয়সে শাশুড়িÑ ননদÑ জায়েদের শাসনের রক্তচক্ষুর চাইতে যৌগিক এই রাগের অভিজাত কিন্তু চঞ্চলা—চপলা—পেলব—মধুর রূপের শুদ্ধতায় খামতি এনে গুরুর অসন্তুষ্টির ভয়টাই বেশি ছিলো বটে। এই রাগ আমাদের ঘরের রাগ, আগ্রা ঘরানার গুরু ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ—ই এই রাগের স্রষ্টা বলে মানা হয়। তাঁরই রচিত, গীত খেয়াল বন্দিশ ‘ঝনঝন পায়েলা বোলে’র ভেতর দিয়ে নট বেহাগ রাগে আমরা প্রাণ দেই, নিজেরা এই রাগের নির্যাস পান করি।
১৯৩৮ সালে এই বন্দিশকে ভেঙে নজরুল দুই স্তবকের গান রচনা করে গাওয়ালেন আমার গুরু, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁয়ের শিষ্য বিদুষী দীপালি নাগকে (তখন দীপালি তালুকদার ছিলেন এক কিশোরী) দিয়েই। সেই গানের ভেতর দিয়ে আমার মতো বাঙালির কাছে নট বেহাগ রাগ নৃত্যরত পাখির রূপ ধরে এসে ধরা দিলো। এই রাগের অনন্য স্বরবিন্যাস স র, র গ, গ ম, ম প যেন নজরুলের কাব্যময়তায় ‘বন—পথে যায় কে বালিকা’র মূর্তরূপ হয়ে উঠলো। আমার বাঙালি হৃদয়েও তেমন নুপুরের ঝনঝনানি নেই, বরং আমাদের পায়ের নুপুরে নজরুল শুনেছেন, আমাদের শুনিয়েছেন মিষ্টি কিন্তু স্পষ্ট ‘রুমঝুম’ শব্দ। আমার কাছে সায়াহ্ন আসে নট বেহাগের সুরে নুপুরের রুমঝুম শব্দে গুরুপ্রণামের মধ্য দিয়ে সুরসন্ধানের গভীর বারতা নিয়ে। সেই বারতায় নজরুল, নট বেহাগ, শ্যাম কল্যাণ, রাতের অন্ধকারে অমৃতালোকের সন্ধান অবিচ্ছেদ্য আর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে, ভরিয়ে রাখে সতত।
রাত গভীর হয়, আসে প্রদোষ। নট বেহাগ থেকে তীব্র আর শুদ্ধ দুই মধ্যম নিয়ে রাতের দ্বিতীয় প্রহর পৌঁছে যায় রাগ ছায়ানটের কাছে। মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে বিস্তারী ছায়ানটে মীড় ও কান—স্বরের ব্যবহা্রে স্বরের মসৃণ সংযোগ ও সূক্ষ¥ অলঙ্করণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, শিখেছি গুরুর কাছে; জেনেছি এতে রাগ সহজাত মাধুর্যে—সৌকর্যে ঋদ্ধ হয়, পূর্ণ হয়। ব্যাকরণ মাফিক শেখা যে বাদী স্বর পঞ্চম আর সমবাদী স্বর ঋষভের মধ্যকার স্বর সঙ্গতি এই রাগকে গভীর হৃদয়গ্রাহী করে তোলে। নট বেহাগের ‘ঝনঝন ঝনঝন পায়েলা’ যেমন ‘রুমঝুম নুপুর’ হয়ে বনপথের বালিকা আর নৃত্যরত পাখি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে, ঠিক তেমন করেই ছায়ানটে পঞ্চম—ঋষভ সঙ্গতির টানে ‘রিনিকি ঝিনিকি ঝিনি বাজে পায়েলা’ আগ্রার মহল ছেড়ে বৃন্দাবন থেকে আসা ‘ভাব—বিলাসিনী না মানে গুরুজন—ভয় লাজে’ অদম্য অভিসারী নওল কিশোরী হয়ে উঠেছে অবলীলায়। অবরোহণের তীব্র মধ্যম যেন ‘বারণ করে তায়, লতিকা ধরি' পায়’ আর নজরুলের শব্দের যাদুময়তায় ‘আবেশ বিহ্বল এলোমেলো কুন্তল ছায়া—নটিনী’ যেন ঠিক এই রাগের বক্র চলনের মূর্তরূপ হয়ে ওঠে। আবার র গ ম প ; গ ম র স ; ম গ ম র স র স স্বরসঙ্গতি এই রাগে বিশেষভাবে মধুর, আবেগপ্রবণ এবং দোলায়িত সুরের আবহ সৃষ্টি করে বোলে গুরুদের কাছে শিখেছিলাম। কিন্তু নজরুল মরমে মননে শব্দময় ছবি এঁকে জানান দিয়ে গেলেন ছায়ানটের সুরে ‘দোলা লাগিল দখিনার বনে বনে, বাঁশরি বাজিল ছায়ানটে মনে মনে, চিত্তে চপল নৃত্যে কে, ছন্দে ছন্দে যায় ডেকে’। আমার প্রদোষ তাই অভিসারী, অভিলাষী প্রেমাবিষ্ট, এতে মিশে আছে ছায়ানটের দোলায়িত মধুময়তা, যাতে শব্দ দিয়ে ছবি এঁকে চলেন আমার নজরুল।
সেই রাত্রি দ্বিপ্রহরে দুই মধ্যম থেকে কড়িকে বাদ দিয়ে বরং শুদ্ধÑ কোমল দুই গান্ধার আর নিষাদ কে সঙ্গী করে আবারও গুরুর হাত ধরে নজরুলে এসে পৌঁছায় রাগ জয়জয়ন্তী। এবার কল্যাণ ঠাট ছেড়ে কাফি ঠাটের আশ্রয় আর ছায়ানটের বাদী—সমবাদী স্বর পঞ্চমÑ ঋষভকে কেবল উলটে দিয়ে ঋষভকে বাদী আর পঞ্চম কে সমবাদী করে জয়জয়ন্তী রাতকে আরও মধুর, বেদনাতুর করে তোলে। ছায়ানটের অভিসার, অনুরাগ জয়জয়ন্তীতে এসে বিরহ বিচ্ছেদ বেদনার শৃঙ্গাররসে জারিত হয়। জয়জয়ন্তীর কোমল আকুলতায় কাঁদে ‘মেঘে মেঘে অন্ধ অসীম আকাশ’, আবার ‘মেঘমেদুর বরষায়, ফুল ছাড়ায়ে কাঁদে বনভূমি’। কোমল আর শুদ্ধ নিষাদ আর কোমল গান্ধারের সাথে অন্যান্য শুদ্ধ স্বরের বিন্যাসে ধ ,ন র ; র গ র স ; ,ন স ; র ম প ন ; ন ধ প চলন শৃঙ্গার ও করুণ রসের সূক্ষ¥ সহাবস্থান প্রকাশ করে এক অপূর্ব অনুভূতি তৈরি করে মনে। ‘প্রিয় নাম ধরে তারে খুঁজি দিকে দিকে, শূন্য গগনে শুধু ঝরে বারি ধারা’ কিংবা ‘ঝুরে বারিধারা, ফিরে এসো পথহারা, কাঁদে নদী তট চুমি’Ñ এই প্রকাশভঙ্গিতে যে তীব্র হাহাকার আছে, গভীর আকুতি আছে তা যেন আবার অবচেতনে জানান দেয়েই প্রেম না পাওয়া প্রেম নয়, অপ্রাপ্তির বিচ্ছেদ নয় বরং পেয়ে হারাবার বেদনাতুর সময়ের কথা স্পষ্টভাবে আঁকে। আর এখানেই জয়জয়ন্তীর সুরে যে আনন্দ—বেদনার সুরময়তা লুকিয়ে আছে, তাকে নজরুল ভাষায় প্রকাশ করেন। আর আনন্দ বেদনার সহাবস্থানকে নজরুল কী অদ্ভুত যাদুতে বরষার সমার্থক করে তুলেছেন। তাই আমার জয়জয়ন্তীর সুরে আমার অশ্রুধারা আর মেঘমন্দ্রিত বারিধারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় গভীর রাতের অন্ধকারে।
জয়জয়ন্তীর অশ্রুধারা থেকে সময় পেরিয়ে বাগেশ্রীর গভীর আকুলতায় ‘পিপাসা মিটায়ে চলি নয়নের নীরে’ নিশীথ রাতে। রাতের সেই শেষ প্রহরে ‘হেরিছে রজনী, রজনী জাগিয়া’ আমার গানে, আমার প্রাণে সুর যোগায় রাগ বাগেশ্রী। সেই কাফি ঠাটের আশ্রয়েই কোমল গান্ধার আর নিষাদ কে সঙ্গী করে ‘চকোর উতলা চাঁদের লাগিয়া, কাঁহা পিউ কাঁহা ডাকিছে পাপিয়া, কুমুদীরে কাঁদাইতে’। বাদী—সমবাদী যুগল মধ্যম আর ষড়জ বাগেশ্রীর সুরে এক গভীর, গম্ভীর আকাক্সক্ষার, নিবিড় প্রতীক্ষার আবেশ তৈরি করে। ‘জনম জনম গেল আশা পথ চাহি’ বা ‘বরষ পরে বরষ আসে যায় ফিরে’ শব্দবন্ধে সেই অটল আকুলতাই নজরুল তুলে ধরেছেন। কোমল নিষাদ আর কোমল গান্ধারের উপস্থিতিতে ন স ম ; স গ ম ; গ র স ; ,ন ,ধ ; ম ধ ন ধ ; ম গ র স স্বরবিন্যাস ‘চির—বিরহিণী রোহিণী ভরণী, অবশ আকাশ বিবশা ধরণী’র অনুভূতিকেই মূর্ত করে। বিশেষ করে কবি যখন বলেন ‘জ্বালিয়া আলেয়া—শিখা, নিরাশার মরীচিকা, ডাকে মরু—কাননিকা শত গীত গাহি’, তখন ধ ন স ম কিংবা ম ম গ স্বরবিন্যাস আরও স্পষ্ট করে দৃশ্যমান হয়, রাগের ব্যাকরণ যেন সাকার অভিব্যক্তিতে প্রতিভাত হয়।
রাতের শেষ প্রহর নিশীথের কান্না বাগেশ্রী রাগ থেকে প্রত্যুষের সন্ধিপ্রকাশে ললিত রাতে ‘নয়নে নাহি ঘুম বসিয়া জাগি’ হয়ে সঙ্গে থাকে। বাগেশ্রীর অপেক্ষা দীর্ঘতর হয় শেষ রাতের ললিতে ‘আমারই মত হায় চাহিয়া আশা পথ, নিশীথের চাঁদ পড়ে গগনে ঢলে’। চাঁদ ঢলে পড়ে, দিনের আট প্রহর শেষ হয় আবার ‘না মিটিতে সাধ মোর নিশি পোহায়’। কিন্তু জীবনের চলার পথে অপেক্ষা থেকে প্রতীক্ষা, চেয়ে না পাবার বেদনা বা পেয়ে হারাবার দুঃখ শেষ হয়না। এই নিয়েই আমার, আমাদের সকলের আটপৌরে জীবন। আমার জীবনের অষ্ট প্রহর জুড়ে কেবল আছে গান, আছে সাংগীতিক ব্যঞ্জনা আরও বেশি করে আছে সুরের খোঁজ। আমি সুখে গাই, শোকে গাই, আনন্দে গাই, গাই বিরহে—অভিমানে—বিচ্ছেদে, এমনকী গাই অভিসারেও। আমার এই আটপ্রহরের সুরে জীবনভর ভাবনার জোগান দিয়ে যাচ্ছেন নজরুল। প্রকৃত অর্থেই তাঁর গানের বাণীকেই মনে, মননে আর মানসে নিয়েই আমি আশৈশব জেনে আর মেনে এসেছি যে ‘রঞ্জকো জনচিত্তানাং স রাগঃ কথিতো বধৈঃ’ — রাগের সরগম দিয়ে যথার্থভাবেই ছবি আঁকা যায়, আর সেই ছবিতে নিজেকে, নিজের আটপৌরে জীবনকেও খুঁজে পাওয়া যায়। নজরুল তাই সত্যিকার অর্থেই আমার আটপ্রহরের ‘পিয়া পিয়া পাপিয়া’।
লেখক পরিচিতি
পেশাগত জীবনে একজন শিক্ষাবিদ ড. নিরুপমা রহমান বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপনার পাশাপাশি উচ্চতর ও বৈশ্বিক শিক্ষাপদ্ধতি উদ্ভাবন আর তার প্রায়োগিক পরিপ্রেক্ষিত গবেষণায় রত আছেন। দীর্ঘদিন উপমহাদেশখ্যাত গুরুদের কাছে তালিম প্রাপ্ত নিরুপমা নিয়মিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আর বাংলা গানের নিরলস সাধনা করে চলেছেন। বাংলা ভাষা—সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গান, তার বাণী ও সুরের মেলবন্ধনকে খুঁজে বেড়ানো, তাকে মননে ও ভাবে ধারণ করবার নিরন্তর প্রয়াসই অভিবাসী জীবনে নিরুপমার বাঙালিয়ানার নিরন্তর উদযাপন।
