আমার দাদুর ধর্মভাবনা— ‘আমার মানুষ ধর্ম’ || অনিন্দিতা কাজী

বিদ্রোহী প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সৌভাগ্যক্রমে আমি যাঁর কনিষ্ঠ উত্তরসূরী তাঁকে মূলতঃ আমার ভিন্ন রাগরাগিণীর বৈচিত্র্যে ভরা গান, কবিতা, কাব্যের মধ্যে দিয়ে খোঁজার, জানার চেষ্টা করি, তাঁকে স্মরণ করি। জীবনের মধ্যগগনে এসে তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করে নাতনি হিসেবে আমার দাদুর জীবনদর্শন কেমন ছিল তা জানার ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে সেই ব্যক্তি নজরুলকে খোঁজার চেষ্টা করেছি যাঁর ধর্মভাবনা ছিল শৈশব থেকেই স্বতন্ত্র। আমার দাদুর অসময়ে বাকরুদ্ধ হওয়া, পরিবারের সকলের একে একে অসময়ে বিদায় নেওয়ায় পারিবারিকভাবে তাঁদের অসম্পূর্ণ কাজ সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার গুরুদায়িত্ব আমি স্বেচ্ছায় নিজের ভালোবাসা দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে প্রায় এক দশক আগে প্রবাসে এসেছিলাম দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে, দাদুর সৃষ্টিকে আমার ক্ষুদ্র প্রয়াসে সকলের মধ্যে বিলিয়ে দিতে। আমি গবেষক বা লেখক নই, আমি আমার দাদুকে একান্তে ধারণ করে আমার মতো করে তাঁকে খুঁজে চলেছি, তাঁর ধর্ম ভাবনা, যা তিনি নিজেই বিভিন্ন সময় লিখে গেছেন। সেগুলোর মাধ্যমেই তাঁর ধর্মপ্রভাবনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র, যা বর্তমান সময়ে পুরো বিশ্বের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে। কল্পনার কোনো অবকাশ নেই আমার এই লেখায়। 

আমার দাদু যা লিখেছেন তাই মনে করতেন, ‘প্রাণে প্রাণে পরিচয় হইয়া যখন দুটি প্রাণ মানুষের গড়া সমস্ত বাজে বন্ধনের ভয় ভীতি দূরে সরাইয়া দহজ সংকোচে মিশিতে পারে, তখনই সেই মিলন সত্যিকারের হয়.আর যে মিলন সত্যিকার, তাহাই চিরস্থায়ী চিরন্তন। 

সত্যিকার মিলন স্বার্থের মিলনে আসমানজমিন তফাৎ। মিথ্যার ওপর ভিত্তি করিয়া কখনো কোনো কার্যে পূর্ণ সাফল্য লাভ হয় না। ধর্ম সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং সত্য চিরদিনই বিশ্বের সকলের কাছে সমান সত্য। এখানেই বুঝা যায় যে, কোনো ধর্ম শুধু কোনো এক বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নয়, তাহা বিশ্বের। আর এই ছুঁৎমার্গ যখন ধর্মের অঙ্গ হয়, তখন নিশ্চয় ইহা মানুষের সৃষ্টি বা খোদার খোদকারী। 

মানুষের সৃষ্টি শৃঙ্খল বা সমাজবদ্ধ সাময়িক সত্য হতে পারে, কিন্তু তাতো শাশ্বত সত্য হইতে পারে না। মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায় যে ধর্ম, তাহা আর যাহাই হোক ধর্ম নয়, ইহা আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি। অন্তর থেকে বলতে পারি যে, আমাদিগকে সীমার মাঝে থাকিয়াই অসীমের সুর বাজাইতে হইবে। 

নিজের ধর্মকে মানিয়া লইয়া সকলকে প্রাণ হইতে দুবাহু বাড়াইয়া আলিঙ্গন করিবার শক্তি অর্জন করিতে হইবে। যিনি সত্যিকারের স্বধর্মে নিষ্ঠ, তাঁহার এই উদার বিশ্বপ্রেম আপন হইতেই আসে।

এসব কথা প্রসঙ্গে দাদু আরো লেখেন, ‘এই প্রসঙ্গে আমার একটি গল্প মনে পড়লএকদিন আমরা কয়েকজন একটি ট্রেনে গিয়া উঠিলাম। আমাদের কামরায় মালা চন্দনধারী অনেকগুলি হিন্দু ভদ্রলোক ছিলেন। আমরা কামরায় প্রবেশ করিবামাত্র অর্থাৎ মাথায় টুপি পগগ দেখিয়াই ছোঁয়া যাইবার ভয়ে তাঁহারা তটস্থ হইয়া অন্য দিকে গিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। সেই বেঞ্চেরই এক প্রান্তে বসিয়া এক পন্ডিতজী বেদ বা ঐরূপ কোনো শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ করিয়া ভদ্রলোকদের শুনাইতেছিলেন। তিনি আমাদের দেখিয়াই এবং আমাদের অপ্রতিভ ভাব দেখিয়া হাসিয়া আমাদের হাত ধরিয়া সাদরে নিজের পার্শ্বে বসাইলেন। ভদ্রলোকদের চক্ষু ততক্ষণে কান্ড দেখিয়া চড়কগাছ! আমরাও তখন সহজ হইয়া পন্ডিতজীকে জিজ্ঞাসা করিলাম যে, তিনি পন্ডিত আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ কুলতিলক হইয়াও কি করিয়া আমাদিগকে এমন করিয়া আলিঙ্গন করিতে পারিলেন, অথচ এই ভদ্রলোকগণ আমাদিগকে দেখিয়া কেন একেবারে দশ হাত লাফাইয়া উঠিলেন? ইহাতে তিনি হাসিয়া বলিলেন, ’দেখ বাবা, আমি হিন্দু ধর্মকে ভালোবাসি সত্য বলিয়া জানি বলিয়া বিশ্বের সকলকে, সকল ধর্মকে ভালোবাসতে শিখিয়াছি। আমার নিজের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস আছে বলিয়াই অন্য সকলকে বিশ্বাস করিবার প্রাণ দিয়া আলিঙ্গন করিবার শক্তি আমার আছে। যাহারা অন্য ধর্মকে অন্য মানুষকে ঘৃণা করে বা নীচ ভাবে, তাহারা নিজেরাই অন্তরে নীচ, তাহাদের নিজেদেরও কোনো শ্রম নাই। তবে ধর্মের যে ঘটাটা দেখ, তাহা অন্তরের দীনতা, হীনতা ঢাকিবার ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র।এটি কোনো বানানো গল্প নয়, সত্যি ঘটনা আমার দাদুর জীবনের এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। 

দাদু তাঁরহিন্দুমুসলমানরচনায় বলেছেন— ‘অবতার পয়গম্বর কেউ বলেননি আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্য এসেছি, আমি খৃস্টানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছিÑআলোর মতো সকলের জন্য। 

কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তরা বললেন, কৃষ্ণ হিন্দুর। মোহাম্মদের ভক্তরা বললেন, মোহাম্মদ মুসলমানের। খ্রিস্টের শিষ্যরা বললেন, খ্রিস্ট খ্রিস্টানদের। কৃষ্ণমোহাম্মদখ্রিস্ট হয়ে উঠলেন জাতীয় সম্পত্তি। আর এই সম্পত্তি নিয়েই যত বিপত্তি! আলো নিয়ে কখনো ঝগড়া করে না মানুষে, কিন্তু গরু ছাগল নিয়ে করে। বেশ মনে পড়ছে, ছেলেবেলায় আমরা সূর্য নিয়ে ঝগড়া করতাম। বলতো, আমাদের পাড়ার সূর্য বড়, বলতো, আমাদের পাড়ার সূর্য বড়। আমাদের গভীর বিশ্বাস ছিল, প্রত্যেক পাড়ায় আলাদা আলাদা সূর্য ওঠে। স্রষ্টা নিয়েও ঝগড়া চলেছে সেই রকম। বলছে আমাদের আল্লাহ, বলছে আমাদের হরি। স্রষ্টা যেন গরু ছাগল, আর তার বিচারের ভার পড়েছে জাস্টিস স্যার আব্দুর রহিম, পন্ডিত মদনমোহন মালব্যর প্রভৃতির ওপর। আর বিচারের ফল মেডিকেল কলেজে গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে

নদীর পাশ দিয়ে চলতে চলতে যখন দেখি, একটা লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষটি তখন প্রশ্ন করার অবকাশ দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান। একজন মানুষ ডুবছে, এইটেই তার কাছে হয়ে ওঠে সবথেকে বড়, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে। হিন্দু যদি উদ্ধার করে দেখে লোকটা মুসলমান, বা মুসলমান যদি দেখে লোকটা হিন্দুÑতার জন্য তো তার আত্মপ্রসাদ এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয় না। তার মন বলে, ‘আমি একজন মানুষকে বাঁচিয়েছিÑআমারই মতো একজন মানুষকে।শুধু একবার এই মহাগগনতলে সীমাহারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়াÑমানব! তোমার কণ্ঠে সৃষ্টির সেই আদিম বাণী ফুটাও দেখি! বলো দেখি, ‘আমার মানুষ ধর্ম’.. দেখিবে, দশদিকে সর্বভৌমিক সাড়ার আকুল স্পন্দন কাঁপিয়া উঠিতেছে। মানবতার এই মহাযুগে একবার গন্ডি কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বলো যে, তুমি মানুষতুমি সত্য।

এই প্রসঙ্গে বলি, আমার দাদু, শৈশবের দুখুমিয়া বালক বয়সে ধর্মচর্চার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় গভীর ঈশ্বর বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। অল্প বয়সে ভারতীয় পুরাণ, বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত গীতা পড়ে সে, অন্যদিকে বিশুদ্ধ উর্দু ফার্সি উচ্চারণে কথা বলতে এবং সুললিত কণ্ঠে যখন দুখু কোরান পাঠ করত লোকে মুগ্ধ হয়ে শুনত। গ্রামে কথকতার আসরেসীতার বনবাসেরগল্প শুনতে শুনতে মুসলমান ভুলে যায় তারা হিন্দু ধর্মের কাহিনী শুনছে। আবার কারবালার গল্প শুনতে শুনতে হিন্দু ভুলে যায় যে তারা মুসলমান ধর্মকাহিনী শুনছে। দুখু উপলব্ধি করেধর্মমানুষকে আলাদা করতে পারে না। মানুষেরধর্মআলাদা হলেওমনআলাদা নয়। আমার দাদুকে খুঁজতে গিয়ে এটুকুই বুঝেছি, জেনেছি কখনো তাঁকে কোনো ধর্মপ্রচারকের ভূমিকায় দেখা যায়নি। তিনি মন্দিরের নয়, মসজিদও তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি কখনো। বরং বলা যায়, মন্দির মসজিদের দুটি পৃথক অবয়ব তাঁর চোখে এক হয়ে একাকার হয়ে দেখা দিয়েছিল। তাই তাঁর মধ্যে পেয়েছি আমরা নতুন যুগের নতুন যোগী, নতুনতর ধর্মপ্রচারের আকৃতি। শুনেছি তাঁর ভেদাভেদ দূর করার একটা মন্ত্র। জ্যৈষ্ঠের ঝড় হয়ে মহাঅভ্যাগতের মতো যেখানে তিনি বসেছেন সেখানেই তাঁর আসন রচিত হয়েছে। যা নড়বড়ে তাকে নাড়া দিয়ে ভেঙেছেন তিনি। যা জীর্ণ তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিগ্বিদিকে দিয়েছে উড়িয়ে, যা যেখানে অন্যায় অসত্য শিকড় গেড়ে বসেছে সুস্থ বলিষ্ঠ জীবনের কণ্ঠরোধ করে, সেখানে আঘাতের পর আঘাত হেনে মূল পর্যন্ত দিয়েছে টলিয়ে। 

হৃদয়ের মাধুর্য দিয়ে তিনি সকল ধর্ম শ্রেণীবৈষম্য দূর করে সকল উঁচু নিচু সমান করে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর ধর্মই হৃদয়ের প্রেমধর্ম, যে প্রেম মানুষের কল্যাণে উৎসারিত হয়ে ওঠে। মানবপ্রেমের ক্ষেত্রে সমস্ত ধর্ম এসে হৃদয়বন্দরে মিলিত হয়েছে, বিশ্ব যেখানে কোলাকুলি করে। তাই তিনি বারে বারে সকলের চেতনা জাগ্রত করতে বলেন

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

যাহারা আনিল গ্রন্থ কেতাব 

সেই মানুষেরে মেরে, পূজিছে গ্রন্থের দল!

মূর্খ সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ 

গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো। 

তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান 

সকল শাস্ত্র খুঁজে দেখ সখা, খুলে দেখ নিজপ্রাণ।

আজ দেশের তথা বিশ্বের কঠিন সময়ে আমার দাদুর শূন্যতা, তাঁর কলমের শক্তিকে খুঁজে ফিরি। চারিদিকে যে অস্থিরতা, ভেদবুদ্ধি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আজ তিনি জীবিত থাকলে, সুস্থ থাকলে তাঁকে নিয়ে যত বিতর্কই হোক, তাঁকে কেউ গ্রহণ করুন বা বর্জন করুন তার কোনোকিছুর পরোয়া না করেই তাঁর চিরাচরিত স্বভাবে, পূর্ণ শক্তি দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদের মাঝে সেতু রচনা করতে পারতেন। এই সময় তাঁর থাকা খুব জরুরি ছিল, আমি অনুভব করি। তাই আমার দাদুর স্বপ্নকে ভাবনাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়ে দাদুর জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য। 

Related Posts